February 23, 2026, 5:03 am

তারাবিতে কোরআন তিলাওয়াত রবের সঙ্গে একান্ত আলাপন

Reporter Name
  • Update Time : Monday, February 23, 2026
  • 21 Time View

মহিমান্বিত রমজান মাস ও পবিত্র আল- কোরআন একটি অপরটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেন এক বৃন্তে দুটি দৃষ্টিনন্দন ফুল। ভাবতেই হৃদয়ে শিহরণ জাগে। ভালো লাগার স্নিগ্ধ সমীরণ বয়ে যায় অন্তর্জগতে। পবিত্র কোরআন মাজিদ রমজানের সৌন্দর্যকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। কোরআন মুমিন হৃদয়ের অনির্বচনীয় প্রশান্তির নাম। কোরআনের স্পর্শ ছাড়া মানব জনম অর্থহীন। এর স্পর্শে মৃতপ্রায় হৃদয় সজীব হয়ে ওঠে। আর রমজানে কোরআনের স্পর্শে মুমিনের অন্তর উদ্বেলিত হয়। হৃদয়ে নামে হেদায়াতের বসন্ত। আর সে বসন্ত পূর্ণতা পায় তারাবির সালাতে পবিত্র কোরআন মাজিদ তিলাওয়াতে। এ যেন রবের সঙ্গে একান্তে আলাপন। যে আলাপনের মজা কখনো শেষ হওয়ার নয়; বরং কেবল বাড়তেই থাকে।

রমজানে কোরআন তিলাওয়াতের মাহাত্ম্য

সারাদিন ক্ষুধা আর পিপাসায় কাতর হয়ে সিয়াম সাধনা শেষে সন্ধ্যায় ইফতার সেরে স্বাভাবিকভাবেই শরীরে রাজ্যের ক্লান্তি নেমে আসার কথা। একটু অলসতায় শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিয়ে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু কোরআনের প্রেমে মাতোয়ারা মুমিনরা সব ক্লান্তি ও অলসতা পায়ে দলে ঠিকই মসজিদে চলে আসেন। এশার ফরজ শেষে ডুব দেন রবের প্রেমের সরোবরে।

মুমিনরা তারাবির সালাতে কোরআন মাজিদ তিলাওয়াতের মাধ্যমে মহান আল্লাহতায়ালার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় মেতে ওঠে। যে আলাপচারিতার মজা সঠিকভাবে ব্যক্ত করতে পারেÑএমন ভাষা বিশ্বে বিরল। প্রশ্ন জাগে, রমজানে কোরআন তিলাওয়াতে এত মজা কেন। বারবার কোরআন তিলাওয়াত করে এবং একাধিকবার শুনেও কেন আশ মেটে না?

সহজ জবাবÑরমজান কোরআন নাজিলের মাস। হ্যাঁ, বিশ্বমানবতাকে সঠিক পথের দিশা দেওয়ার দৃপ্ত শপথে বলীয়ান হয়ে যে কোরআন পৃথিবীতে এসেছে, সেই কোরআন মাজিদ কবে নাজিল হয়েছেÑতার জবাবে কোরআন জানাচ্ছে, ‘রমজান সেই মাস, যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে’ (সুরা বাকারা- ১আট৫)।

সার কথা, রমজান মাস কোরআন নাজিলের মাস হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই রমজানে হৃদয়ে কোরআনের বসন্ত নামে। অন্তর কোরআনের আলোয় ভরে ওঠে। আর তারাবির সালাতে কোরআন তিলাওয়াতে সেই বসন্ত ষোলকলায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। রমজানে কোরআন তিলাওয়াতের স্বাদে মোহিত হওয়ার এটাই মৌলিক রহস্য।

কোরআনের সুরে মুখরিত দিগন্ত

একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশে হাফেজে কোরআনদের সংখ্যা ছিল খুব কম। পুরো অঞ্চল চষে বেড়িয়ে হাফেজ খুঁজে পাওয়া কষ্টকর ছিল। একদল হাফেজ আলেমের নিরন্তর প্রচেষ্টায় ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সবুজ বাংলাদেশে হাফেজে কোরআনদের রীতিমতো বিপ্লব ঘটেছে। লাখ লাখ হাফেজে কোরআন বের হচ্ছেন মাদরাসাগুলো থেকে। ফলে রমজানে তারাবির সালাতে দেশের প্রায় তিন লাখ মসজিদ মুখরিত থাকে পবিত্র কোরআন মাজিদের সুমধুর তিলাওয়াতে।

মসজিদের তুলনায় হাফেজে কোরআনের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় অনেক বাসাবাড়ি কিংবা অফিসেও তারাবির জামাতে হাফেজরা কোরআন তিলাওয়াত করেন। এ গৌরব বাংলাদেশের। এ মর্যাদা লাল-সবুজের। এ সম্মান আল্লাহর পক্ষ থেকে এ দেশের তাওহিদী জনতার প্রতি বিশেষ পুরস্কার।

তারাবির রাকায়াত : বিতর্ক ছাড়ুন

তারাবির সালাত ২০ রাকায়াতÑএটাই সঠিক কথা। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম ২০ রাকাআত পড়েছেন। এর পক্ষে অসংখ্য দলিল রয়েছে। ভারত উপমহাদেশে জালেম ইংরেজদের অশুভ অনুপ্রবেশের আগে এ বিষয়ে কিছু বলার বা লেখার প্রয়োজন হতো না। গোটা ইসলামি দুনিয়ায় সাহাবায়ে কেরামের স্বর্ণযুগ থেকেই প্রতিটি মসজিদে ২০ রাকআত তারাবি চলে আসছে।

ইংরেজদের প্রত্যক্ষ মদতে মুসলমানদের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপপ্রয়াসের অংশ হিসেবে আলেম নামধারী এক শ্রেণির অপরিপক্ব চিন্তার লোক আট রাকআত তারাবির প্রোপাগান্ডা চালায়। যদিও দক্ষ ও প্রাজ্ঞ আলেমদের শক্ত প্রতিরোধে আট রাকআত তারাবির প্রোপাগান্ডা এখন অনেকটা ম্লানই বলা যায়। এসব প্রোপাগান্ডায় প্রভাবিত না হয়ে ২০ রাকআত তারাবিতে কোরআন শোনায় মনোযোগ দিন। হৃদয়কে আলোকিত করুন।

তাড়াহুড়ো নয়, তারতিলের সঙ্গে পড়ুন

কিছু অতিউৎসাহী মানুষ যারা কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রাখে না, তারা তারাবির সালাতে দ্রুতগতিতে কোরআন তিলাওয়াতের ব্যাপারে হাফেজদের বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করে। এটা খুবই নিন্দনীয় কাজ। এই হীন স্বভাব পরিহার করতে হবে। তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে কোরআনের নির্দেশনা হচ্ছে, তারতিল অর্থাৎ ধীরে-সুস্থে পড়া। তাড়াহুড়োর ক্ষেত্রে অনেক সময় অর্থের বিকৃতি ঘটে, যা চূড়ান্ত পর্যায়ের ধৃষ্টতা বৈ কিছু নয়। তাই তারতিলের ব্যাপারে যত্নশীল হওয়ার বিকল্প নেই।

কোরআনের শিক্ষা গ্রহণে চেষ্টা করুন

কোরআন মাজিদ তিলাওয়াতে সওয়াবের জন্য এর অর্থ বোঝা জরুরি নয়। না বুঝে পড়লে বা শুনলেও প্রতি হরফে নেকি রয়েছে। সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু কোরআন থেকে পরিপূর্ণ উপকৃত হতে কোরআনের হিদায়াত বা নির্দেশনা জানার বিকল্প নেই। কোরআন নাজিলের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো কোরআনের আয়াতের শিক্ষা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা। ইরশাদ হয়েছে, ‘(হে রাসুল) এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি; যাতে মানুষ এর আয়াতের মধ্যে চিন্তা করে এবং বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা যাতে উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা ছোয়াদ-২৯)

নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থের আলোকে তারাবিতে পঠিত অংশটুকুর তাফসির দেখে নেওয়ার মাধ্যমে তাদাব্বুর বা শিক্ষা গ্রহণের কাজটি করে নিতে পারেন। এছাড়াও মুয়াসসাসা ইলমিয়া বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত মাওলানা রাশেদুর রহমানের লেখা ‘এক ঝলকে কোরআন কারিম’ বা আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত শায়েখ আহমাদুল্লাহ হাফিযাহুল্লাহর লেখা ‘তারাবির সালাতে কোরআনের বার্তা’ বই দুটি পড়তে পারেন।

অনর্থক কথা-কাজ পরিহারপূর্বক যথার্থ পন্থায় সিয়াম সাধনা, সালাতুত তারাবিহ এবং কোরআন মাজিদের প্রতি আত্মনিয়োগের মাধ্যমে আসুন আমাদের রমজানকে অর্থবহ করে তুলি। হৃদয়ে হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ুক কোরআনের বসন্ত। তাকওয়ার সৌরভে সুরভিত হোক প্রতিটি মানব জীবন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © ajkerdorpon.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com