বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘোষিত ইশতেহার পাঁচটি মূল বিষয়ের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন, ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার, অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন এবং ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও জাতীয় সংহতি—এই পাঁচটি মূল বিষয়ের উপর ভিত্তি করেই ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে।
মাহদী আমিনের দেওয়া সেই ফেসবুক পোস্টটি তুলে ধরা হলো—
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ (শুক্রবার) দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলমান সীমাহীন নির্যাতন-নিপীড়ন, গুম-খুন, দমন-দুঃশাসন পেরিয়ে এবং গণঅভ্যুত্থানের প্রেরণায় বাংলাদেশ এক যুগসন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেশের প্রতি এবং দেশের মানুষের প্রতি বিএনপির দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই, একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুসমন্বিত রাষ্ট্রপরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরা হয়েছে। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে বিএনপি যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়, তবে এই ইশতেহার বাস্তবায়নে আমরা বদ্ধপরিকর থাকবো, ইনশাআল্লাহ।
এই ইশতেহারে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রসংস্কারের ঐতিহাসিক ১৯ দফা, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঘোষিত ভিশন ২০৩০, তারেক রহমান ঘোষিত ২৭ দফা ও ৩১ দফার ধারাবাহিকতা ও সমন্বয় সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। পাশাপাশি, তারেক রহমান স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের দিন যে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বলেছিলেন, I have a plan সেই পরিকল্পনার মূল ভাবনাগুলোও এই ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার; বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন; ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার; অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন; এবং ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও জাতীয় সংহতি—এই পাঁচটি মূল বিষয়ের উপর ভিত্তি করেই বিএনপির এই ইশতেহার। সুবিস্তৃত ও সুনির্দিষ্ট এই ইশতেহারের মধ্য থেকে কয়েকটি বিষয় আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই।
নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে, যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে পরিবারের নারী সদস্যদের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি পরিবারকে মাসিক ২৫০০ টাকা অথবা সমপরিমাণ প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য সরবরাহ করা হবে।
একই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ভর্তুকি, কৃষিঋণ ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হবে। পাশাপাশি কৃষকদের সুরক্ষায় আধুনিক কৃষি বীমা ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক ও গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশ হবেন নারী। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে। মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে আনন্দময় ও কর্মমুখী পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হবে এবং শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি চালু করা হবে। সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস দেওয়ার পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে বিএনপি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাস্থ্য ও হাইজিনকে প্রাধান্য দেওয়া হবে এবং বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালু করা হবে।
নতুন কুঁড়ি কোরআন তেলাওয়াত প্রবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হবে, এবং যেসব হাফেজে কুরআন, ক্কারী এবং আলেম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখবেন তাঁদের রাষ্ট্রীয় সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদান করা হবে।
তরুণ সমাজের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্ট-আপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সংযুক্তিকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি। ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণের পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, ক্যাফে ও লাইব্রেরিতে পর্যায়ক্রমে ফ্রি ওয়াইফাই চালু করা হবে। ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ই-লার্নিং সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নেওয়া হবে।
ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে। একই সঙ্গে কর্মস্থলে নারীদের জন্য ডে-কেয়ার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বৃক্ষ রক্ষণাবেক্ষণে ট্রি মনিটরিং অ্যাপ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সার্কুলার ফিউচার মডেল বাস্তবায়ন করা হবে। বনাঞ্চল, জলাভূমি, চারণভূমি, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও অভয়ারণ্য সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম যেমন পেপাল চালু, এবং বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইবে ও আলিবাবার আঞ্চলিক হাব প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপি পূর্বঘোষিত ৩১ দফা ও “জুলাই সনদ” বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের তালিকা প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের কল্যাণে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের নামে দেশজুড়ে গড়ে তোলা হবে নানা স্থাপনা ও অবকাঠামো।
বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে এবং দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে নীতি হবে, ‘অন্যায়কারীর পরিচয় শুধুই অন্যায়কারী।’ মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ গড়তে যথাসময়ে পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে। ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ প্রকল্পের আওতায় নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পণ্য উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হবে।
প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী কার্ড প্রদান, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট, স্কুল ও মোবাইল হেলথ ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শক্তিশালী চতুর্মাত্রিক সশস্ত্রবাহিনী ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে। ঢাকার ওপর চাপ কমাতে সেকেন্ডারি সিটিগুলোকে কার্যকর করা হবে। “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার” মূলনীতির ভিত্তিতে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবেন।
মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস এবং মহানবী (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতা ও আদর্শকে সমুন্নত রেখে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় বিএনপির মূলমন্ত্র হবে ন্যায়পরায়ণতা ও ইনসাফ। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি সমন্বিত, ন্যায়ভিত্তিক ও শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিএনপি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি গড়ার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে বিএনপি আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে এগিয়ে যেতে চায়। সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে বৈদেশিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে, সর্বোচ্চ প্রাধান্য পাবে দেশ ও জনগনের স্বার্থ। গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ।’
তারেক রহমানের নেতৃত্বে এক যুগেরও বেশি সময়ের নীতিনির্ভর রাজনীতি বিএনপির এই ইশতেহারে প্রতিফলিত হয়েছে। জনগণের ভোটে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে, নেতার দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে আগামীর বিএনপি সরকার।