নিউজ ডেস্ক:
অবশেষে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আজ সোমবার সন্ধ্যা ছয়টায় দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারি বাসভবন যমুনায় যাবে।
আজ দুপুর সোয়া একটার পর গণমাধ্যমে পাঠানো এনসিপির এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, প্রতিনিধিদলে আরও থাকবেন দলের কেন্দ্রীয় নেতা সারোয়ার তুষার, মনিরা শারমিন, জাবেদ রাসিন ও জহিরুল ইসলাম মূসা।
গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট ‘না’-এর তুলনায় দ্বিগুণের বেশি পেয়ে জয়ী হয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার-সংক্রান্ত প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার পরই সনদে স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত নেয় এনসিপি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা তরুণদের গড়া এ দলটি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সক্রিয় প্রচার চালিয়েছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কারের অঙ্গীকার করে। এর অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসন—এই ছয় খাতে সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। পরবর্তীতে আরও কয়েকটি খাতে সুপারিশ প্রণয়নে কমিশন করা হয়।
প্রথম দফায় গঠিত ছয়টি কমিশনের সুপারিশের মধ্যে ১৬৬টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম শুরু হয়। ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্যে পৌঁছায় কমিশন। এসব প্রস্তাব নিয়েই প্রণয়ন করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ।
এই ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সংক্রান্ত। অন্য প্রস্তাবগুলো সরকারি আদেশ, অধ্যাদেশ বা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য। ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নও করেছে।
তবে সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাব অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই এসব প্রস্তাব নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ১৯টি প্রস্তাবকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ‘মৌলিক সংস্কার’ হিসেবে চিহ্নিত করে।
গত বছরের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়। ওই অনুষ্ঠানে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল ও জোট সনদে সই করে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরাও স্বাক্ষর করেন। পরে আরও একটি দল সনদে সই করে। তবে সেসময় এনসিপি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি।
সনদ স্বাক্ষরের আগের দিন এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছিলেন, কোনো দল প্রাথমিকভাবে সই না করলেও পরবর্তীতে স্বাক্ষরের সুযোগ থাকবে।
তখন সনদে সই না করার কারণ ব্যাখ্যা করে এনসিপি তিনটি দাবি তোলে। সেগুলো হলো—জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের খসড়া আগেই প্রকাশ করতে হবে; আদেশটি প্রধান উপদেষ্টাকে জারি করতে হবে; এবং গণভোটে সনদের পক্ষে রায় এলে নোট অব ডিসেন্টের কার্যকারিতা থাকবে না। পাশাপাশি তারা চেয়েছিল, গণভোটের রায় অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ তার গাঠনিক ক্ষমতাবলে সংবিধান সংস্কার করবে এবং সংশোধিত সংবিধানের নাম হবে ‘বাংলাদেশ সংবিধান, ২০২৬’।
পরবর্তীতে গত ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেন। ওই আদেশের অধীনেই ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
গণভোটে সনদের পক্ষে রায় ঘোষণার পর এনসিপির এই স্বাক্ষর-উদ্যোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন তাৎপর্য সৃষ্টি করেছে।