February 23, 2026, 2:39 am
Title :
মালয়েশিয়ায় ৭.১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাত ‘চাঁদার জন্য’ চালককে হত্যায় জামায়াত আমিরের নিন্দা প্রটোকল ছাড়া সেই পুরোনো রিকশায় ঘুরছেন ভূমিমন্ত্রী ভারতের রেকর্ড জয়যাত্রা থামাল দ. আফ্রিকা তিন পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ শেষে মিলবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, আবেদন করতে যা যা লাগবে “সমঝোতা বনাম বাধ্যবাধকতা: চাঁদা প্রসঙ্গে মন্ত্রীর বক্তব্য” বগুড়া-৬ আসনে আলোচনায় জুবাইদা-জাইমা-শর্মিলা সহিংসতা বন্ধ না হলে আরেকটি অভ্যুত্থানের সাক্ষী হতে পারে বাংলাদেশ: গোলাম পরওয়ার বাংলাদেশের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক জোরদারে ভারত আগ্রহী: হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা ইউনূস সেন্টারে ফিরলেন ড. ইউনূস

“সমঝোতা বনাম বাধ্যবাধকতা: চাঁদা প্রসঙ্গে মন্ত্রীর বক্তব্য”

Reporter Name
  • Update Time : Sunday, February 22, 2026
  • 41 Time View

লেখাটা শুরু করব একটি চিন্তাইয়ের ঘটনা দিয়ে ৯০ এর দশকে ঢাকায় দুইজন ছিনতাইকারী রিস্কা থামিয়ে যাত্রীদের বললেন যা আছে বের কর যাত্রীর সবকিছু দিয়ে কিছু টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ছিনতাইকারীরা বলল দেখো টাকার গায়ে কি লেখা আছে, যাত্রী টাকার উপরে লেখা পড়ল- লেখা আছে চাহিবা মাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে। ব্যাস ছিনতাইকারী বলল এখানে আপনার টাকা আর আমরা বাহক।
এটাই হচ্ছে সমঝোতার মধ্যে আদান-প্রদান।

সড়কে বিভিন্ন পরিবহন থেকে সমঝোতার ভিত্তিতে টাকা নেওয়া হলে সেটা চাঁদা নয়, বরং টাকা দিতে বাধ্য করা হলে সেটা চাঁদা বলে এমন মন্তব্য করে সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ব্যাপক সমালোচনা এসেছেন। আমি জানিনা সমঝোতা (Consensus) বলতে কি বোঝাতে চেয়েছেন?
সাধারণ সমঝোতা হলো দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে কোনো বিষয়ে একমত হওয়া। কিন্তু সরকারি বা প্রশাসনিক লেনদেনের ক্ষেত্রে “সমঝোতা” শব্দটি ভিন্ন অর্থ বহন করে যেমন: আইনি সমঝোতা, যখন কোনো আইনি চুক্তির মাধ্যমে দুই পক্ষ শর্তসাপেক্ষে একমত হয় যেমন- টেন্ডার প্রক্রিয়া।
অনৈতিক সমঝোতা: যখন কোনো সরকারি কর্মকর্তা তার দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে সেবা গ্রহীতার কাছ থেকে অর্থ বা সুবিধা গ্রহণ করেন এবং সেবা গ্রহীতাও দ্রুত কাজ পাওয়ার আশায় তা দিতে রাজি হন। মন্ত্রীর বক্তব্যে সম্ভবত এই ধরণের লেনদেনকে “সমঝোতা” বলা হয়েছে।

মন্ত্রীর এই বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্কের জন্ম দেয়, বিশ্লেষণ এই বক্তব্যটি কেন গ্রহণযোগ্য নেই, আইনি দৃষ্টিকোণ (The Legal Lens)
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি (Penal Code, 1860) এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী:
কোনো সরকারি কর্মচারী যদি তার আইনগত পারিশ্রমিকের বাইরে কোনো আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেন, তবে সেটি ঘুষ হিসেবে গণ্য হবে।
এখানে পক্ষগুলোর মধ্যে “সমঝোতা” ছিল কি না, তা বড় কথা নয়; বরং লেনদেনটি অবৈধ কি না, সেটিই মুখ্য। আইন অনুযায়ী, দাতা এবং গ্রহীতা—উভয়ই অপরাধী।

নৈতিক দৃষ্টিকোণ (The Ethical Lens)
সরকারি সেবা পাওয়া নাগরিকের অধিকার। এই সেবার বিনিময়ে নির্ধারিত “ফি” বাইরে এক টাকাও অতিরিক্ত নেওয়া অনৈতিক। সমঝোতার নামে টাকা নেওয়া মূলত “দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ” (Institutionalization of Corruption)। এটি সৎ কর্মকর্তাদের নিরুৎসাহিত করে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেয়।
ইন্টারন্যাশনাল (TI) এর মতে, ঘুষ হলো অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার। যদি সমঝোতার ভিত্তিতেও টাকা নেওয়া হয়, তবে সেটি সরাসরি সুশাসনের পরিপন্থী।

ঘুষ বনাম বাধ্য করা (Extortion) মন্ত্রী সম্ভবত একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝাতে চেয়েছেন,
ঘোষ: (সমঝোতা) প্রক্রিয়া উভয় পক্ষই লাভের আশায় রাজি থাকে। উদ্দেশ্য অবৈধ সুবিধা বা দ্রুত কাজ হাসিল
জবরদস্তি বা চাঁদা:প্রক্রিয়া এক পক্ষ ভয় দেখিয়ে অন্যকে বাধ্য করে। উদ্দেশ্য ক্ষতি থেকে বাচা বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ।
আইনি অবস্থান দাতা ও গ্রহীতা উভয়ই সমান অপরাধী। এখানে দাতা মূলত ভুক্তভোগী হিসেবে গণ্য হতে পারেন।
মন্ত্রীর এই বক্তব্যটি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক মনে হলেও রাষ্ট্রীয় নীতি ও আইনের দৃষ্টিতে এর গ্রহণযোগ্যতা নেই। সমঝোতার ভিত্তিতে টাকা নেওয়া মানেই হলো দুর্নীতির একটি “সহজ সংস্করণ” তৈরি করা। সরকারি অফিসে যখন লেনদেন হয়, তখন তা আর ব্যক্তিগত সমঝোতা থাকে না; তা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে নষ্ট করে।

আলোচনা মূল বিষয় শ্রমিক ইউনিয়নের চাঁদাবাজি নিয়ে মন্ত্রী শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষে তার অবস্থান ক্লিয়ার করেছেন,
বাংলাদেশে পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন বেসরকারি বা অনানুষ্ঠানিক সংগঠনের নামে চাঁদাবাজির অস্তিত্ব কেবল আছেই নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় ক্ষত হিসেবে চিহ্নিত। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি সবচেয়ে সংগঠিত এবং প্রকাশ্য। বাংলাদেশে নিবন্ধিত প্রায় ৯ লাখের বেশি বাণিজ্যিক যানবাহন রয়েছে।
রাজনৈতিক ভাবে সুবিধাজনক মনে হলেও রাষ্ট্রীয় নীতি ও আইনের দৃষ্টিতে এর গ্রহণযোগ্যতা নেই। সমঝোতার ভিত্তিতে টাকা নেওয়া মানেই হলো দুর্নীতির একটি “সহজ সংস্করণ” তৈরি করা।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদাবাজির বিষয়টি জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি। নৈতিকতার মাপকাঠিতে চাঁদাবাজির কোনো বৈধতা নেই। এটি মূলত একটি সামাজিক ও আইনি অপরাধ।
প্রতিটি ধর্ম এবং প্রচলিত আইনে অন্যের সম্পদ জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়াকে কেবল চরম অন্যায় নয় বরং শোষণ ও জুলুম বলব।
একজন উদ্যোক্তা বা সাধারণ মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে যা উপার্জন করেন, তার ওপর অন্যের কোনো অধিকার নেই। ভয় দেখিয়ে টাকা নেওয়া মূলত মানুষের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তার পরিপন্থী এবং এটা মানবাধিকার লঙ্ঘন।
আর চাঁদাবাজির ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ বেড়ে যায়, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর যাহার সার্বিক অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
চাঁদাবাজির কোনো সুনির্দিষ্ট “অফিসিয়াল সংখ্যা” বের করা কঠিন, কারণ এর বেশির ভাগই ঘটে পর্দার আড়ালে এবং ভুক্তভোগীরা ভয়ে অভিযোগ করেন না। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর কয়েকটি প্রধান খাতগুলো সনাক্ত করা যায়।
পরিবহন খাত বাস, ট্রাক ও অটোরিকশা থেকে দৈনিক কয়েক কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়। এটি সবচেয়ে বড় খাত।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) এবং বিভিন্ন শ্রমিক নেতার দেওয়া তথ্যমতে, সড়ক পরিবহন খাতে দৈনিক প্রায় ১১ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৪,০০০ (চার হাজার) কোটি টাকার বেশি চাঁদা তোলা হয়।
আগে সরাসরি রাস্তায় দাঁড়িয়ে লাঠি উঁচিয়ে চাঁদা তোলা হতো। এখন পদ্ধতি বদলেছে। বাস বা ট্রাক টার্মিনাল ছাড়ার সময় ‘গেট পাস’ বা ‘কল্যাণ তহবিল’-এর নামে রসিদ দিয়ে টাকা নেওয়া হয়।
মন্ত্রীর এই বক্তব্যটি
ফুটপাত ও হকার বড় বড় শহরের ফুটপাত দখল করে দোকান বসানোর বিনিময়ে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়া হয়।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (BIGD)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ঢাকাতেই বছরে প্রায় ২,১৬০ কোটি টাকা ফুটপাত থেকে চাঁদা হিসেবে আদায় করা হয়।
নির্মাণ খাত বাংলাদেশের নির্মাণাধীন প্রকল্পের চাঁদাবাজি বর্তমানে একটি আলোচিত এবং স্পর্শকাতর বিষয়। নতুন বাড়ি বা ভবন নির্মাণ করতে গেলে স্থানীয় প্রভাবশালী গ্রুপকে বড় অংকের টাকা দিতে হয়। দেখাতে বিভিন্ন সিন্ডিকেট যেমন– পণ্য সরবরাহে সিন্ডিকেট, পার্সেন্টেজ বা কমিশন, যাতায়াত ও মালামাল খালাসে বাধা ইত্যাদি।

হাট-বাজার সাধারণ সবজি বিক্রেতা থেকে শুরু করে আড়তদারদের পণ্য নামানো ও বিক্রির সময় চাঁদা দিতে হয়।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে অনেক জায়গায় চাঁদাবাজদের “মুখ” বদলেছে কিন্তু “পদ্ধতি” বদলায়নি বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের অভিযোগে উঠে আসছে।

স্থানীয় সরকার ও রেল মন্ত্রী‌ বদিউল আলম জুলাই বিপ্লবের পর চাঁদাবাজি এবং অন্যান্য অপরাধের জন্য বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন এবং নাটকীয়ভাবে ইলেকশনের পূর্বে দলীয় বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে এমপি ইলেকশন নির্বাচন করে নির্বাচিত হন। (যদিও নির্বাচনে ইন ফলাফলে ইঞ্জিনিয়ারিং করেন নির্বাচিত হয়েছে বলে বিতর্ক রয়েছে) এবং মন্ত্রীত্বের আসনে বসে চাঁদাবাজির নতুন সংজ্ঞা আবিষ্কার করেছেন এতে জনমনে নতুন করে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করছে। শ্রমিক ইউনিয়নের তত্ত্বাবধানে সংগঠিত চাঁদাবাজী গ্রুপটাকে পরোয়া করে তুলবে। সন্ত্রাস এবং দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হলে সরকার তার প্রতিশ্রুতির ৩১ দফা অকার্যকর এবং জন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। সুতরাং এই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দেশ এবং দলের স্বার্থে প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।

মিসবাহ উদ্দিন আহমেদ
নিউইয়র্ক

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © ajkerdorpon.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com