আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
গত এপ্রিল ৩ দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের আকাশে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল (ভাইপার ২১) ভূপাতিত হয়। এই যুদ্ধবিমানের দু’জন সৈন্য বহন করে। একজন পাইলট এবং আরেকজন অস্ত্র নিক্ষেপকারী। বিমানটি বিধ্বস্ত হবার পূর্বে দুজনেই সফলভাবে বিমান থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। মার্কিন বাহিনীর তাৎক্ষণিকভাবে পাইলটকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও অস্ত্র নিক্ষেপকারী সৈন্য প্যারাসুট নিয়ে অবতরণের সময় সামান্য আহত হওয়ার কারণে তিনি মার্কিন নেটওয়ার্ক থেকে কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে যান। ফলে তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
এর প্রধান কারণ, এই সৈন্য ইরানিদের হাতে পড়লে তাকে জিম্মি করে যুদ্ধ বন্ধে ইরানিরা দর কষাকষি শুরু করতে পারত কিংবা ইরানি
সেনাবাহিনী মার্কিন যুদ্ধ পরিকল্পনা, সেনা অবস্থান, কৌশল প্রভৃতি বিপুল পরিমাণ তথ্য যা এই সৈন্যের মাথায় ও স্মৃতিতে ছিল তা হাতিয়ে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারত এমন আশঙ্কা ছিল তাদের। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ট্রাম্প সরকারকে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হতো এমন আশঙ্কা থেকে এই সৈন্যকে উদ্ধার করার জন্য মার্কিন সেনাবাহিনী ইতিহাসের এক স্মরণীয় অভিযান শুরু করে।
একটি ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক দাবি করেছে, “ট্রাম্প প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমাকে বলেছেন যে, ওয়েপনস সিস্টেমস অফিসারকে খুঁজে বের করার আগে এবং মার্কিন উদ্ধার অভিযান শুরু হওয়ার আগে, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি একটি বিভ্রান্তিকর প্রচারণা শুরু করেছিল। ইরানের অভ্যন্তরে গুজব ছড়ানো হয়েছিল যে মার্কিন বাহিনী তাকে ইতিমধ্যেই খুঁজে পেয়েছে এবং তাকে স্থলপথে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছে।”
“এক কর্মকর্তার মতে, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) তাদের অনন্য সক্ষমতা ব্যবহার করে ওয়েপনস সিস্টেমস অফিসারকে খুঁজে বের করে — ‘এটি ছিল খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতো একটি চিরায়ত ঘটনা, তবে এবারের সূঁচটি ছিল পাহাড়ের ফাটলে লুকিয়ে থাকা এক সাহসী আমেরিকান, যিনি সিআইএ-এর সক্ষমতা ছাড়া অদৃশ্য ছিলেন,’ তিনি বলেন।”
“সূত্রের মতে, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি অবিলম্বে পাইলটের সঠিক স্থানাঙ্ক পেন্টাগন, মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব এবং হোয়াইট হাউসের সাথে শেয়ার করে।”
“প্রেসিডেন্ট অবিলম্বে একটি উদ্ধার অভিযান শুরুর নির্দেশ দেন, যা পেন্টাগন কার্যকর করে, এবং একই সাথে সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি এই অভিযানের সমর্থনে রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করতে থাকে।”
এদিকে পেন্টাগনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, “চূড়ান্ত পর্যায়ে, ভূপাতিত এফ-১৫ই বিমানের দ্বিতীয় ক্রু সদস্যকে (ওয়েপনস সিস্টেমস অফিসার) উদ্ধার করার পর, দুটি সি-১৩০ পরিবহন বিমান, যেগুলোর বিশেষ বাহিনীর সদস্য ও পাইলটদের একটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কথা ছিল, সেগুলো ইরানের অভ্যন্তরে একটি প্রত্যন্ত স্থানে আটকা পড়ে। কমান্ড সমস্ত মার্কিন সামরিক কর্মী ও পাইলটদের উদ্ধারের জন্য তিনটি অতিরিক্ত বিমান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়, এবং একই সাথে দুটি অচল বিমান ধ্বংস করে দেওয়া হয় যাতে সেগুলো ইরানিদের হাতে না পড়ে।”
তবে মার্কিন সূত্র গুলোর এই দাবি অস্বীকার করেছে ইরান। আইআরজিসির মুখপাত্র এফ-১৫ পাইলট উদ্ধারের বিষয়ে ট্রাম্পের পোস্টের জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সর্বশক্তিমান আল্লাহর কৃপায় ও ঐশ্বরিক সহায়তায় এবং ইসলামিক বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সেনাবাহিনী, বীর বাসিজ ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর ইসলামী যোদ্ধাদের সময়োচিত পদক্ষেপ ও যৌথ অভিযানের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের ভূপাতিত যুদ্ধবিমানের পাইলটকে উদ্ধারের মরিয়া প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। দক্ষিণ ইসফাহানে শত্রুপক্ষের আক্রমণকারী বিমানগুলো, যার মধ্যে দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার এবং একটি সি-১৩০ সামরিক পরিবহন বিমান ছিল, সেগুলো আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে এবং ইসলামের বীর যোদ্ধাদের ক্রোধের আগুনে পুড়ছে।
এছাড়াও আইআরজিসি ট্রাম্প এবং পশ্চিমা গণমাধ্যমের দাবি উড়িয়ে দিয়ে বেশ কিছু ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করেছে। সকল ভিডিও ও ছবিতে দেখা যাচ্ছে, পাইলটকে উদ্ধার করতে আসা মার্কিন পরিবহন বিমান হেলিকপ্টার ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ ঘটনাস্থলে পড়ে রয়েছে। সেখান থেকে ধোঁয়া উঠছে। তবে এ সকল যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টারে বহন করা কতজন মার্কিনি সৈন্য হতাহত হয়েছে বা আটক হয়েছে কিংবা তারা সবাই বেরিয়ে যেতে পেরেছে কিনা এ ব্যাপারে কোন তথ্য তারা দেয়নি। এছাড়াও এই যুদ্ধে ইরানি পক্ষের হতাহতের সংখ্যা বলা হয়নি। মার্কিনীরাও এ ব্যাপারে নীরব। কিন্তু যে সকল ছবি পাওয়া গেছে তাতে একটা ধারণা পাওয়া যায়, ইরানিরা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি দুঃস্বপ্নের রাত উপহার দিয়েছে। যাতে তাদের একাধিক যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে।
এ ঘটনার পর মার্কিন নৌবাহিনীর চার-তারকা পদমর্যাদার কর্মকর্তা এবং নেভি সিলস (SEALs)-এর প্রাক্তন সৈনিক রিয়ার অ্যাডমিরাল উইলিয়াম ম্যাকক্র্যাফিন ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন: “আপনার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আপনি আমাদের সন্তানদের সামনে আমাদের লজ্জিত করেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমাদের অপমানিত করেন এবং সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো, আপনিই আমাদের নিয়তি।”
বিভিন্ন মার্কিন ওপেন সোর্স গ্রুপে হলিউডের মুভির মত এই অভিযানের একটি বর্ণনা প্রকাশ করা হয়েছে। একে আমেরিকার ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্ধার অভিযান দাবি করে তার যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে সেটি নিম্নরূপ:
এপ্রিল ৩ :
দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের আকাশে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল (ভাইপার ২১) ভূপাতিত হয়। ম্যাক ২.৮ গতিতে বাধা দেওয়া, প্রক্সিমিটি ফিউজের বিস্ফোরণ। উভয় ক্রু সফলভাবে ইজেক্ট করেন।
ঘণ্টা ০ : গ্রাউন্ড টিম কয়েক মিনিটের মধ্যে পাইলটকে উদ্ধার করে। বিমানচালক একা, আহত (গোড়ালি ভাঙা) অবস্থায় শত্রুপক্ষের গভীর ভূখণ্ডে অবতরণ করেন।
ঘণ্টা ১-৪ : বিমানচালক রাতের অন্ধকার ও ভূখণ্ড ব্যবহার করে আত্মগোপন শুরু করেন। আইআরজিসি ড্রোন ও কুকুর দিয়ে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু করে। স্থানীয় জনগণ ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরোধী।
ঘণ্টা ৪-৮ : পুরস্কারের লোভে হাজার হাজার ইরানি বেসামরিক নাগরিক এই অনুসন্ধানে যোগ দেয়। যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা পুরস্কার ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের রাডার ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
ঘণ্টা ৮-১২ : আহত হওয়া সত্ত্বেও ডব্লিউএসও ৭,০০০ ফুট উঁচু পাহাড় চূড়ায় আরোহণ করেন। আইআরজিসি-র অতিরিক্ত সৈন্যের আগমন ঠেকাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রেটারের রাস্তাগুলোতে হামলা চালায়।
ঘণ্টা ১২-১৮ : ডব্লিউএসও শৈলশিরার চূড়ায় পৌঁছে পাথুরে ফাটলে লুকিয়ে পড়েন। মিত্রবাহিনীর সাথে প্রথম সংক্ষিপ্ত রেডিও যোগাযোগ স্থাপন করেন।
ঘণ্টা ১৮-২৪ : চীনা ম্যানপ্যাডের গুলিতে একটি এ-১০ ওয়ারথগ বিমান ভূপাতিত হয়। নৌবাহিনীর সহায়তায় পাইলটকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
ঘণ্টা ২৪-৩০ : উদ্ধারের চেষ্টাকালে দুটি এইচএইচ-৬০ডব্লিউ উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার ভূমি থেকে ছোড়া গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্রুরা আহত হলেও ঘাঁটিতে ফিরে আসেন।
ঘণ্টা ৩০-৩৬ : আইআরজিসি-র বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি আরও তীব্র করে। অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়া ড্রোন হামলা থেকে ডব্লিউএসও বেঁচে যান এবং গোলাগুলির মধ্যেই নতুন জায়গায় অবস্থান নেন।
৩৬-৪২ ঘণ্টা : রাত্রিকালীন পূর্ণাঙ্গ উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। বিশেষ অভিযান দল প্রবেশ করে এবং আইআরজিসি-র সাথে গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়। দুটি সি-১৩০ (C-130) বিমান ইরানের অভ্যন্তরে একটি প্রত্যন্ত ঘাঁটিতে আটকে যায়। তারা বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়নি। কমান্ডাররা শত্রু অঞ্চলে তিনটি বিকল্প বিমান নিয়ে আসেন।
৪২-৪৮ ঘণ্টা : প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে থেকে ডব্লিউএসও-কে শনাক্ত করে ঘটনাস্থলে স্থিতিশীল করা হয় এবং উদ্ধার করা হয়। ইরানের হাতে পড়া ঠেকাতে দুটি অচল বিমানই মাটিতে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। ইরানি সামরিক বাহিনীর অতিরিক্ত সহায়তা আটকাতে রাস্তাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টায় কনভয়গুলোর জন্য ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। সেখানে বোমা বর্ষণ করা হয়।
৫ এপ্রিল — ভোর
ডব্লিউএসও-কে জীবিত ও সচেতন অবস্থায় বের করে আনা হয়েছে। এফ-১৫ই বিমানের উভয় ক্রু সদস্য নিরাপদ আছেন। তারা অসুস্থ ও হাসপাতালের চিকিৎসাধীন। এই বর্ণনা মার্কিন ওপেন সোর্স গ্রুপের। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এটি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তবে নির্ভরযোগ্য সংবাদ চ্যানেল মেগাট্রন এ ব্যাপারে একটি পরিসংখ্যান দিয়েছে। তাদের দাবি, পাইলটকে উদ্ধারের চেষ্টাকালে যুক্তরাষ্ট্র গত রাতে আরও দুটি সি-১৩০ পরিবহন বিমান হারিয়েছে।
এনওয়াইটি জানিয়েছে যে, ইরানে অভিযান চলাকালে বিমানসেনাদের বহন করার জন্য নির্ধারিত দুটি মার্কিন পরিবহন বিমান প্রথমে অচল ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং পরে সেগুলোকে উড়িয়ে দেওয়া হয়। বিমান দুটি
আক্রান্ত হওয়ার পর, দ্বিতীয় দলটিকে উদ্ধারের জন্য নতুন বিমান পাঠানো হয়। যুক্তরাষ্ট্র হতাহতের কথা অস্বীকার করলেও, ঘটনাস্থলের ছবি দেখে মনে হচ্ছে, এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। ইরান স্থানীয় মিলিশিয়াদের হাতে ৫ জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে।
একই সংস্থার আরেক রিপোর্ট বলা হয়েছে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত দুটি মার্কিন সি-১৩০ বিমানের ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া ছবিতে আরও একটি এমএইচ-৬ লিটল বার্ড হেলিকপ্টারও ধ্বংস হতে দেখা যাচ্ছে, যদিও এনওয়াইটি-র প্রতিবেদনে এর কোনো উল্লেখ নেই। এর ফলে আপাতত দুটি সি-১৩০ এবং একটি হেলিকপ্টার ধ্বংস হলো।
সব মিলিয়ে এই সংস্থাটি মার্কিন ক্ষয়ক্ষতির যে বিবরণ দিয়েছে তা নিম্নরূপ: ইরানের আকাশে ভূপাতিত F-15E জেটের দুই ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করতে গিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর বিমানের ক্ষয়ক্ষতি:
নিশ্চিত ক্ষয়ক্ষতি (বর্তমান হিসাব):
— ১টি F-15E স্ট্রাইক ঈগল — ধ্বংস হয়েছে।
— ২টি HH-60 হেলিকপ্টার — ক্ষতিগ্রস্ত।
— ১টি MH-6 লিটল বার্ড — ধ্বংস হয়েছে।
— ১টি A-10 থান্ডারবোল্ট II — ধ্বংস হয়েছে।
— ২টি C-130 হারকিউলিস — ধ্বংস হয়েছে।
— ১–২টি MQ-9 রিপার — ধ্বংস হয়েছে।
সম্ভাব্য / অনিশ্চিত ক্ষয়ক্ষতি:
— ১টি F-16 ফাইটিং ফ্যালকন — জরুরি সংকেত।
— ১টি KC-135 স্ট্রাটোট্যাঙ্কার — জরুরি সংকেত।
— ১টি A-10 থান্ডারবোল্ট II — সম্ভাব্য জরুরি অবতরণ (সন্দেহজনক)।