বারুদের গন্ধ আর যুদ্ধের আর্তনাদ ছাপিয়ে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মুখোমুখি হওয়াটা বিশ্ব রাজনীতির জন্য যেমন স্বস্তির, তেমনি বড় এক পরীক্ষার নাম। গত কয়েক সপ্তাহের ভয়াবহ লড়াইয়ের পর দুই পক্ষ যখন আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি হয়েছে, তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—আসলেই কি এই আলোচনার মাধ্যমে শান্তির পথে ফেরা সম্ভব? সহজভাবে দেখলে, এই সংলাপের সাফল্যের সম্ভাবনা নির্ভর করছে মূলত দুই পক্ষের ‘চাহিদা’ আর ‘বাস্তবতা’র মিলের ওপর।
সাফল্যের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো—শান্তির প্রয়োজন এখন সবার। ইরান চাচ্ছে তাদের ওপর আসা অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ কমিয়ে কিছুটা স্বস্তিতে ফিরতে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও চাপ বাড়ছে যেন মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুন আর না ছড়ায়। মাঝখানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের উপস্থিতি একটি ইতিবাচক দিক। পাকিস্তান এমন একটি দেশ যার সাথে তেহরান ও ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষই কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তাই ইসলামাবাদে অন্তত বড় কোনো যুদ্ধের হাত থেকে বিশ্বকে বাঁচানোর মতো একটি প্রাথমিক সমঝোতা হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটাও বেশ জটিল এবং রক্তক্ষয়ী। এই আলোচনার সাফল্যের পথে সবচেয়ে বড় কাঁটা হলো আস্থার চরম অভাব এবং মাঠপর্যায়ের সহিংসতা। শান্তি আলোচনার ঠিক আগমুহূর্তে যুদ্ধবিরতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে লেবাননজুড়ে ইসরাইলের তুমুল হামলা পরিস্থিতিকে খাদের কিনারায় নিয়ে গেছে। এই হামলায় কয়েকশ মানুষ হতাহত হওয়ায় শান্তির পরিবেশ বিষিয়ে উঠেছে। আলোচনা যখন চলবে, ঠিক তখনই যদি এমন বড় কোনো হামলা ঘটে, তবে টেবিলের কথাবার্তা মুহূর্তেই ভেস্তে যেতে পারে। এর আগেও এমন অনেক সাময়িক চুক্তি হয়েছে যা শেষ পর্যন্ত টেকসই হয়নি। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান এবং ইরানের ওপর কঠোর সব শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা এই সংলাপকে দীর্ঘস্থায়ী করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।
সহজ কথায় বলতে গেলে, লেবাননে ইসরাইলের এই সাম্প্রতিক হামলা ইসলামাবাদের আলোচনাকে এক প্রকার অর্থহীন করে তুলছে। ইরান ইতোমধ্যে হুমকি দিয়েছে যে হামলা না থামলে তারা চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাবে। সুতরাং, কোনো জাদুকরী সমাধান আসবে—এমনটা ভাবা হয়তো ঠিক হবে না। তবে যুদ্ধের ময়দান থেকে সরে এসে অন্তত কথা বলা শুরু করাটাই একটা বড় সাফল্য হতে পারত। যদি এই দুই সপ্তাহের বিরতিকে কাজে লাগিয়ে একে অপরের ন্যূনতম শর্তগুলো মেনে নেওয়া যায়, তবে হয়তো বড় কোনো বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। তবে চূড়ান্ত সাফল্য তখনই আসবে, যখন ড্রোন আর মিসাইল হামলার বদলে আলোচনার টেবিলে কূটনীতি জিতবে।
আপাতত এই আলোচনাকে একটি ‘লাইফলাইন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কিন্তু লেবাননের রক্তক্ষরণ বন্ধ না হলে এই লাইফলাইন যে কোনো সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।