রাজশাহী শহরের বিভিন্ন প্রসিদ্ধ বিপণনকেন্দ্রে ক্রেতাশূন্যতার কারণে ব্যবসায়ীরা মারাত্মক আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন। সাহেববাজার, আরডিএ মার্কেট এবং নিউ মার্কেটের বিভিন্ন পোশাক, জুতা ও প্রসাধনসামগ্রীর দোকানে দিনভর অলস সময় কাটাচ্ছেন বিক্রেতারা। সারাদিন দোকান খোলা রেখেও কাঙ্ক্ষিত ক্রেতার দেখা মিলছে না, ফলে দৈনিক বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। অনেকেই দোকানে এসে পণ্য দেখেশুনে দামদর করলেও শেষ পর্যন্ত না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন। উৎসব বা বিশেষ মৌসুম ছাড়া বেশিরভাগ দিনই ব্যবসায়ীদের বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে না পেরে অনেক ব্যবসায়ীই এখন পুঁজি হারিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন।
এই ক্রেতা সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিংয়ের সমস্যা। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সারা দিনে চার থেকে পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনা নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যখন বিকেলের পর কিছুটা বেচাকেনা শুরু হয়, ঠিক সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়েই বিদ্যুৎ উধাও হয়ে যায়। একটানা দেড় থেকে দুই ঘণ্টা, ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অতিরিক্ত গরম ও আলোর অভাবে গ্রাহকরাও বেশিক্ষণ মার্কেটে টিকতে পারেন না। জেনারেটর চালিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও ডিজেলের বাড়তি দামের কারণে ব্যবসায়িক খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
এদিকে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী রাত আটটার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ করতে বাধ্য হওয়ায় ব্যবসার পরিধি আরও সংকুচিত হয়েছে। এর ফলে দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, নিয়মিত ট্যাক্স এবং ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই মার্কেটগুলোর পাশাপাশি অনলাইনে কেনাকাটার প্রবণতা বৃদ্ধি এবং ফুটপাতের দোকানের আধিক্যের কারণেও শোরুমগুলোতে ক্রেতা কমছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে ফুটপাতের ব্যবসা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা কম মূল্যে জিনিসপত্র কেনার জন্য সেদিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে নির্দিষ্ট কর দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা স্থায়ী ব্যবসায়ীরা তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছেন এবং অনেকেই পুঁজি রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে ব্যবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত সংকটজনক সময় বলে অভিহিত করেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান মনে করেন, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং মানুষের আয় না বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এর ওপর বারবার বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য স্বল্পমেয়াদে পরিকল্পিত বিদ্যুৎ রেশনিং চালুর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি, যাতে নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ছোট উদ্যোক্তাদের রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।