ইসলামে আগুন দিয়ে কোনো মানুষের জীবন, সম্পদ বা গৃহ ধ্বংস করা কেবল দুনিয়ার আইনে অপরাধ নয়—বরং পরকালে জাহান্নামের শাস্তির কারণ। নবীজি (সা.)-এর নির্দেশ অনুযায়ী- ‘আগুন দিয়ে কেবল আল্লাহ শাস্তি দেন’, তাই কোনো মানুষ এ সীমা অতিক্রম করলে তা আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শামিল। এছাড়া অগ্নি-নাশকতা, শান্তিময় পরিবেশকে ভীতিকর করে তোলা, জনমনে ত্রাস সৃষ্টি করা, যেকোনো উপায়ে নিরপরাধ কাউকে হত্যা করা বা হত্যাচেষ্টা করা, অথবা অপরাধী কোনো ব্যক্তিকেও বেআইনিভাবে হত্যা করা বা হত্যাচেষ্টা করা হারাম।
অগ্নিদগ্ধ করা একটি পাপ ও অপরাধ; অন্যের জীবন, সম্পদ বা বসতি নষ্ট করা (فساد في الأرض) ‘ফাসাদ ফি আল-আরদ’ (পৃথিবীতে অনর্থ বিবাদ সৃষ্টি) হিসেবে গণ্য, যা ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। তার সমাজঘাতী স্বভাব, ব্যক্তিগত ক্ষতি ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে ইসলামি আইনে ও নৈতিকতায় এর শাস্তি ও প্রতিকার কঠোর ও অপরিহার্য। কুরআনের একাধিক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
১. وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ
‘যে প্রাণ আল্লাহ হারাম করেছেন, তাকে ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া হত্যা করো না।’ (সুরা আল-ইসরা: আয়াত ৩৩)
২. وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ
‘তোমরা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করো না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ৬০)
৩. مَنۡ قَتَلَ نَفۡسًۢا بِغَیۡرِ نَفۡسٍ اَوۡ فَسَادٍ فِی الۡاَرۡضِ فَكَاَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِیۡعًا ؕ وَ مَنۡ اَحۡیَاهَا فَكَاَنَّمَاۤ اَحۡیَا النَّاسَ جَمِیۡعًا ؕ
‘যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে এবং যে কারো জীবনরক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে।’ (সুরা আল মায়েদা: আয়াত ৩২)
৪. وَ مَنۡ یَّقۡتُلۡ مُؤۡمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَآؤُهٗ جَهَنَّمُ خٰلِدًا فِیۡهَا وَ غَضِبَ اللّٰهُ عَلَیۡهِ وَ لَعَنَهٗ وَ اَعَدَّ لَهٗ عَذَابًا عَظِیۡمًا
‘যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাক্রমে মুসলমানকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্য ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।’ (সুরা আন নিসা: আয়াত ৯৩)
এই আয়াতগুলো স্পষ্ট করে যে, অন্যায়ভাবে একজন মানুষ হত্যা করাকে কুরআনে কারিমে ‘সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার’ নামান্তর আখ্যায়িত করা হয়েছে।
আগুন দিয়ে ধ্বংস করা হারাম
আগুন দিয়ে মানুষ বা সম্পদ ধ্বংস করা আল্লাহর বিশেষ গুণাবলির সীমা লঙ্ঘন করা—এটি মারাত্মক গুনাহ ও অপরাধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) আগুন দিয়ে মানুষ বা প্রাণীকে শাস্তি দেওয়া বা হত্যা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। হাদিসে এসেছে-
لَا يُعَذِّبُ بِالنَّارِ إِلَّا اللَّهُ
‘আগুন দ্বারা শাস্তি দেয় কেবল আল্লাহ; মানুষের উচিত নয় আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়া বা ধ্বংস করা।’ (বুখারি ৩০১৬, মুসলিম ১৭৪৪)
অগ্নিসংযোগকে ‘হারাবা’ (সশস্ত্র সন্ত্রাস বা ধ্বংসাত্মক অপরাধ) হিসেবে গণ্য করা হয়। ইসলামি ফিকহি (আইনে) অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে ক্ষতি করা বা হত্যা করা ‘হিরাবাহ (الحرابة)’ বা ‘ফাসাদ ফি আল-আরদ’ অপরাধের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ
‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং জমিনে ফাসাদ করে বেড়ায়, তাদের আজাব (শাস্তি) কেবল এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে কিংবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে।’ (সুরা আল-মায়িদা: আয়াত ৩৩)
অর্থাৎ যারা সমাজে অগ্নিসন্ত্রাস, ভয়, ধ্বংস ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে—তাদের শাস্তি হতে পারে মৃত্যুদণ্ড, ক্রুশবিদ্ধ করা, হাত-পা কাটা, অথবা পরিস্থিতি ও অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী দেশ থেকে নির্বাসন।
আগুনে পুড়িয়ে মারার ফলে একসাথে কয়েকটি অপরাধ সংঘটিত হয়, এর কোনো কোনোটি তো শিরকের পর্যায়ভুক্ত। হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো মানুষ, জীব-জন্তু বা কোনো ফসল-গাছ-পালাকে আগুনে পোড়াতে নিষেধ করেছেন। নবীজি (সা.) আরও বলেন, ‘আগুন দ্বারা কেবল আল্লাহই শাস্তি দেবেন, আগুনের রব (আল্লাহ) ছাড়া আর কারো আগুন দ্বারা শাস্তি দেওয়া উচিত নয়।’ -বোখারি ও আবু দাউদ
রাসুলুল্লাহ (সা.) কাফের-মুশরেকদের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে কাউকে আগুনে পোড়ানোর অনুমতি দেননি। কারণ জাহান্নামে আল্লাহতায়ালা অপরাধীদের জন্য আগুনের শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। জাহান্নামকে আরবিতে ‘নার’ বা আগুন বলা হয়েছে। তাই এ শাস্তি কোনো মানুষ দিতে চাইলে এতে আল্লাহর বিশেষ শাস্তি প্রয়োগের ক্ষমতায় যেন তার সমাসীন হওয়ার দাবি চলে আসে। তাই কাউকে আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়া নিষেধ।