ভূরাজনৈতিক খেলায় পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি সার্কাসের রিংয়ের খেলোয়াড়ের মতো অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে, যেখানে নিখুঁত ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ দরকার। একদিকে চীন ‘সর্বকালীন বন্ধু’, যারা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি)-এ ৭০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে। এটি বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একক বৃহত্তম প্রকল্প, যা ইসলামাবাদের জন্য প্রধান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নোঙর হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের লেনদেনমূলক বাস্তববাদী নীতির কারণে ঐতিহাসিকভাবে অস্থির অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র এখন নতুন করে আকৃষ্ট হচ্ছে। এই ‘ডাবল গেম’ বা একই সঙ্গে দুজনের সঙ্গে খেলার মধ্যে যে দ্রুত পরিবর্তনশীল দ্বন্দ্বগুলো থাকে সেগুলো সাম্প্রতিক দুটি যুগপৎ ঘটনার কারণে আরও বড় অস্বস্তি তৈরি করেছে। একটি হলো, মস্কো ফরম্যাট ঘোষণায় পাকিস্তানের অনুমোদন এবং মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছে পাশনি বন্দর তুলে দেওয়ার নীরব প্রস্তাব।
আফগানিস্তানবিষয়ক মস্কো ফরম্যাট বৈঠকে ভারত, ইরান, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়াসহ প্রধান আঞ্চলিক শক্তিগুলো উপস্থিত ছিল, যা এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে শেষ হয়। এতে ‘আফগানিস্তানের ভেতরে ও আশপাশে’ বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বাগরাম বিমানঘাঁটি পুনরুদ্ধারের ইচ্ছা ট্রাম্প প্রকাশ করার পর এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অবস্থান পুনরুদ্ধারের চেষ্টার বিরুদ্ধে এটি একটি সরাসরি প্রতিক্রিয়া। বাইডেন প্রশাসন আফগানিস্তান থেকে তাড়াহুড়ো করে পশ্চাদপসরণ করার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ঘাঁটি পরিত্যাগ করে। মস্কো ফরম্যাটের বিবৃতি এবং বৈঠকের আনুষ্ঠানিক অবস্থান বেইজিং ও মস্কোর কৌশলগত অগ্রাধিকারের সঙ্গে জোরালোভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা পাকিস্তানকে মেনে নিতে হয়েছে।
তবুও প্রায় একই সময়ে খবরে প্রকাশ, অতি ক্ষমতাধর সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, বেলুচিস্তানের পাশনিতে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বাণিজ্যিক বন্দর নির্মাণ ও তত্ত্বাবধান-সংক্রান্ত পরিকল্পনা মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে পেশ করেছেন। পাশনির অবস্থান ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশাল চীন-সমর্থিত গোয়াদর বন্দর থেকে মাত্র ৭০ মাইল দূরে এবং ইরান সীমান্তের কাছে, যা পাকিস্তানের দাবিকৃত কথিত বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ পদার্থের মজুতে প্রবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদিও কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন যে, পাশনি প্রস্তাবটি সম্পূর্ণরূপে বাণিজ্যিক এবং বিশেষভাবে সামরিক ব্যবহারের বিষয় এতে নেই। এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব উপেক্ষা করা অসম্ভব। এটি আরব সাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চীনা প্রভাবকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে, যা ওয়াশিংটনের জন্য অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
বেইজিংয়ের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক কাঠামোগত, যা কয়েক দশক ধরে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও বিশাল সিপিইসি বিনিয়োগের ওপর নির্মিত। চীন পাকিস্তানের বেঁচে থাকার উপায়। জাতিসংঘে কূটনৈতিকভাবে দেশটিকে যে রক্ষা করে এবং অপারেশন সিন্দুরের সময় উপগ্রহ থেকে রিয়েল-টাইম অপারেশনাল গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে, পাশাপাশি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করে সে চীন। এর অর্থ হলো মস্কো ফরম্যাটের মার্কিনবিরোধী সামরিক অবস্থান আপসযোগ্য নয়, এটি চীন-পাকিস্তান কৌশলের মূল ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত।
পরিশেষে, পাকিস্তানের বর্তমান ভূরাজনৈতিক খেলা একটি স্বল্পমেয়াদি টিকে থাকার কৌশল, যা ধূর্ততাপূর্ণ কূটনৈতিক কৌশলের ছদ্মবেশ ধারণ করে। লেনদেনের পদ্ধতি তাৎক্ষণিক সুবিধা প্রদান করলেও এটি তার কূটনৈতিক আস্থা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। তিনটি প্রধান শক্তিকে একে অপরের বিরুদ্ধে খেলার জন্য পরিশেষে সম্পূর্ণরূপে মূল্য চুকাতে হতে পারে পাকিস্তানকে। এত চালাকি করে পাকিস্তান সম্ভবত নিজেকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।