নিউজ ডেস্ক:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নাটাই উত্তর ইউনিয়নের রাজঘর গ্রামের হেলাল মিয়া (৬৫) জন্মান্ধ। ১৩ জনের পরিবারে তিনিসহ ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিসহ ৯ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তাদের আয়ের একমাত্র উৎস জেলা শহরের পৌর মুক্তমঞ্চে গান গেয়ে আর্থিক সহায়তা নেওয়া। এই গানই তাদের জীবন ও সংসারের চাকা ঘোরাত। সম্প্রতি গান গাইতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা বাধা দেওয়ায় পরিবারটি বিপাকে পড়েছে।
আলোচিত বাউল আবুল সরকারের বিচারের দাবিতে গত বুধবার দুপুরে জেলা শহরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে। মিছিল থেকে ফেরার সময় মুক্তমঞ্চে গান গাইতে বাধা দেওয়া হয় হেলাল মিয়া ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের। এরপর থেকে এই পরিবারটি শহরে না গিয়ে বিষণ্ন মনে বাড়িতে বসে আছে। চার দিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
শনিবার সন্ধ্যায় হেলাল মিয়ার বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, তিনি পৌর মুক্তমঞ্চে শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টায় যান। তিন ঘণ্টা গান করে দুপুর ১টায় যা আয়-রোজগার হয়, তা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। প্রতিদিনের মতো গত বুধবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে তারা মুক্তমঞ্চে সপরিবারে গান করছিলেন।
এ সময় তারা মিছিলের আওয়াজ শুনে গান বন্ধ করে যন্ত্রপাতি গুছিয়ে বসে থাকেন। মিছিল থেকে কিছু মাদ্রাসা ছাত্র এসে গান করতে বাধা দেয়। গান করলে তারা যন্ত্রপাতি ভেঙে ফেলবে বলে হুমকি দেয়। হুমকি পেয়ে তারা চার দিন ধরে আর মুক্তমঞ্চে গান গাইতে যাচ্ছেন না।
হেলাল মিয়া বলেন, ‘আমরা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। নিয়মিত নামাজ পড়ি। আমি ও পরিবারের সদস্যরা ৫০ বছর ধরে পুরাতন কাচারি এলাকা (অধুনালুপ্ত জেলা জজ কোর্ট) ও মুক্তমঞ্চে গান করি। লোকজন গান শুনে খুশি হয়ে যা ইচ্ছা দেন। কোনো দিন হাজার টাকা পাই। কোনো দিন কম পাই, আবার বেশিও পাই। বৃষ্টি-বাদলা হলে অটোরিকশা ভাড়াও বাড়িত থাইকা আইসা দিতে হয়। আমরা কোনো ধর্মবিরোধী গান করি না, বাউল দর্শনেও বিশ্বাস করি না।’
তিনি জানান, এই ঘটনা তাঁর জীবিকা বন্ধ করে দিয়েছে। এ ছাড়া তিনি অন্য কোনো কাজও করতে পারেন না। উপায়ান্তর না পেয়ে ঘটনাটি বিএনপির কয়েকজন নেতাকে জানিয়েছেন। তিনি আশা করছেন, তারা একটি সমাধান দেবেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাঁচার জন্য আর কোনো অবলম্বন নেই। যদি গান গাইতে না পারি। তাহলে ১৩ জনকে না খাইয়া মরতে হইব।’
হেলাল মিয়া ছাড়াও তাঁর পরিবারের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী অন্য সদস্যরা হলেন– তাঁর ছেলে সাদেক মিয়া (৪৫), মেয়ে খায়রুন্নেছা (৪০), ছেলে ফারুক মিয়া (৩০), তারেক মিয়া (২৫) ও বারেক মিয়া (২০), নাতনি কোরআনে হাফেজ রোকসানা (১৬), নাতি মোস্তাকিম (১১) ও মুজাহিদ (১০)।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও জেলা হেফাজতে ইসলামের সভাপতি আল্লামা মুবারক উল্লাহ জানান, তিনি কিছু জানেন না। মাদ্রাসার ছাত্ররাও তাঁকে জানায়নি। তবে মাস ছয়েক আগে একবার এমনটি হয়েছিল। তখন তাঁকে (হেলাল মিয়া) বলা হয়েছিল, গান না গেয়ে যেন গজল কিংবা হামদ-নাত করে। তখন বিএনপি নেতারাও এ বিষয়ে কথা বলেছিলেন।
জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। মেয়র থাকাকালীন আমি তাঁকে মুক্তমঞ্চে গান গাওয়ার জন্য বসিয়েছিলাম। হেলাল মিয়া মুক্তমঞ্চে গান গাইতে এলে আমরা লোক দাঁড় করিয়ে রাখব। আশা করি, কেউ বাধা দেবে না।’