প্রায় ৩৩ বছর আগে ব্রাজিলের রিও শহরে হয়েছিল জাতিসংঘের প্রথম ধরিত্রী সম্মেলন, যেখান থেকে শুরু হয় বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনার পথচলা। এবার সে দেশেই আমাজন বনের শহর বেলেমে বসেছে জাতিসংঘের ৩০তম জলবায়ু সম্মেলন– কপ৩০। গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া দুই সপ্তাহব্যাপী এ সম্মেলনে বিশ্বের প্রায় সব দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
সম্মেলনে গত দুদিনে বিভিন্ন দেশ ন্যায়ভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন, অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ও জবাবদিহির জোর দাবি তুলেছে। বাংলাদেশও তাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছে– প্রতিশ্রুত অর্থ যেন বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয় এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। তবে এবার বেলেমজুড়ে চলছে আশা ও হতাশা।
বেলেমে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার দেশটি কপ৩০-এ অংশ নিচ্ছে ‘সতর্ক আশাবাদ’ নিয়ে।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, কপ২৯-এ নতুন অর্থায়ন কাঠামো হলেও বাস্তবায়ন অনিশ্চিত। আমরা চাই অনুদান ও ক্ষয়ক্ষতি তহবিলে ধীরে হলেও বাস্তব অগ্রগতি হোক; সঙ্গে থাকুক জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা।
তিনি মনে করেন, ঘোষিত ৩০০ বিলিয়ন ডলার কিছুটা অগ্রগতি হলেও তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর দাবি করা ১.৩ ট্রিলিয়নের অনেক নিচে। এর বড় অংশ যদি ঋণ বা বেসরকারি বিনিয়োগ হিসেবে আসে, তাহলে তা দরিদ্র দেশগুলোর ঋণভারই বাড়াবে। তবে অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি তহবিলে নতুন মনোযোগ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে তাদের দাবি জোরালোভাবে উপস্থাপনের সুযোগ দিচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা বলেন, আর ফাঁপা প্রতিশ্রুতির সময় নেই। তাঁর ভাষায়, কপ২৯-এর ৩০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অপর্যাপ্ত, ১.৩ ট্রিলিয়নে উন্নীত করার রূপরেখাও অস্পষ্ট।
ঢাকায় ৫০টির বেশি সংগঠন নিয়ে গঠিত ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যালায়েন্স-বাংলাদেশ দাবি তুলেছে, বেলেমের সম্মেলনে ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাদের বক্তব্য, উন্নত দেশগুলোকে অনুদানভিত্তিক, পূর্বনির্ধারিত ও স্বচ্ছ অর্থায়ন দিতে হবে; নীতি প্রণয়নে সমতা, লিঙ্গসমতা ও আদিবাসী অধিকারকে প্রাধান্য দিতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বেঁচে থাকার লড়াই। এক মিটার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে দেশের এক-তৃতীয়াংশ উপকূলীয় এলাকা স্থায়ীভাবে পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। অথচ অভিযোজন ও নিম্ন-কার্বন উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রতিবছর বাংলাদেশের প্রয়োজন প্রায় ১২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; কিন্তু দেশটি পাচ্ছে এর ১১ শতাংশেরও কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সহজ শর্তে অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি। কপ৩০ সফল হলে তা শুধু আরেকটি নীতি চুক্তি নয়; এটি হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ার একটি বাস্তব পদক্ষেপ।
জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবিতে মাঠেও সক্রিয় হয়েছে তরুণ প্রজন্ম। মঙ্গলবার নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইয়ুথ কল ফর ফেয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স’ শীর্ষক বিশেষ ক্যাম্পেইনে শিক্ষার্থীরা স্লোগান তুলেছেন– ‘অভিযোজন ফান্ডের টাকা নিয়া টালবাহানা চলবে না’। পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (প্রাণ), ফেয়ার ফাইন্যান্স বাংলাদেশ কোয়ালিশন, অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ এবং কোস্টাল এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্ক যৌথভাবে এই আয়োজন করে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাওসেডের নলেজ ম্যানেজমেন্ট টিম লিডার সালাহ উদ্দিন বলেন, এবারের সম্মেলনে আমরা চাই ক্ষতিপূরণ ও অভিযোজন তহবিলের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে।
ক্ষতিপূরণ হিসেবে এখন যা পাওয়া যায়, তা দাবির তুলনায় অনেক কম বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, তার ওপর তা ঋণ আকারে আসে; অথচ এই অর্থ গ্র্যান্ট হিসেবে পাওয়া উচিত ছিল। তাই এবার এ দাবিকে আরও জোরালো করার পরিকল্পনা রয়েছে।