গণভোটের সময় ও জুলাই সনদে দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে বিপরীতমুখী অবস্থানে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীসহ আটদল। রাস্তার আন্দোলনে নেমে জামায়াত দাবি করেছিল, জাতীয় নির্বাচনের আগেই হতে হবে গণভোট।
ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিএনপির দাবি ছিল, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশে যেন দলগুলোর ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট রাখা হয়।
গণভোটের সময় নিয়ে নমনীয় জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি চেয়েছিল, রাষ্ট্রপতি নয়, আদেশ জারি করতে হবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে।
তিনপক্ষের মতবিরোধের মধ্যে বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মধ্যপন্থাই নিলেন প্রধান উপদেষ্টা; ঘোষণা দিলেন, জাতীয় নির্বাচন আর গণভোট একই দিনে হবে।
আবার জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশে গণভোটের জন্য প্রশ্ন এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে, যেখানে কয়েকটি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্টের প্রতিফলন নেই। আর তিনি নিজে নন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনই জারি করলেন আদেশ।
প্রধান উপদেষ্টার এই ঘোষণার পর বিএনপি বলেছে, ভাষণের মাধ্যমে ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ ‘লঙ্ঘন’ করেছেন মুহাম্মদ ইউনূস।
একই দিনে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন করার যে সিদ্ধান্ত অন্তবর্তী সরকারের কাছ থেকে এসেছে তাতে ‘জনআকাঙ্খা পূরণ হয়নি’ বলে মনে করছে জামায়াতে ইসলামী।
পরিস্থিতির আলোকে একটা ‘মধ্যমপন্থা’ নেওয়ার চেষ্টা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সিদ্ধান্তের মধ্যে দেখছেন বিশ্লেষকরা। রাজনৈতিক দলগুলোকে এখন সে অনুযায়ী এগিয়ে যাবে বলে আশা করছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে যা করা দরকার অন্তর্বর্তী সরকার তাই করেছে। জুলাই সনদ তো রাজনৈতিক দলগুলোই করেছে। গণভোটের কারণে যদি দ্বিমত হয়ে যায় তাহলে তো হয় না।
এখন দ্রুত নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “যত দ্রুত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে ততই পরিস্থিতি শান্ত হবে। সব দল যদি তাদের প্রচারে গণভোটের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে সমস্যা থাকার কথা না।”
গণভোটে চারটি প্রশ্নের ওপর ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অসংখ্য প্রশ্ন রাখার চেয়ে চারটায় নেমে আসছে। এটাও ভালো, কারণ গণভোট তো করতে হবে।”
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের কাছে মনে হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা ‘বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে সঠিক উদ্যোগ’।
তার ভাষায়, “আমার তো মনে হয়, সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে আহ্বান জানানো হয়েছিল। তারা যেহেতু আসেননি, সেক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টার উদ্যোগটা তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিল।
“তিনি সবদিকের কথা মাথায় রেখেই একটা মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটা পথ রেখা তৈরি হবে।”
রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রায় আট মাসের সংলাপ শেষে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং এই সনদের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিরোধ বাঁধে।
সবশেষ, সনদ বাস্তবায়নের গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে মতবিরোধ তীব্র হয়। তবে এই বিরোধকে একপাশে রেখে ঐকমত্যে পৌঁছানো একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাবের ভিত্তিতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫’–এ স্বাক্ষর করে দলগুলো।
২৫টি রাজনৈতিক দলে ও জোটের নেতাদের পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা এই দলিলে সই করেন।
সবশেষ গেল ২৮ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত সুপারিশমালা প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সঙ্গে দেওয়া হয় জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের পৃথক দুটি খসড়া।
গণভোটের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, সেটা সংসদ নির্বাচনের দিনেও হতে পারে, নির্বাচেনের আগেও হতে পারে।
ঐকমত্য কমিশন সে আদেশের যেই দুই খসড়া জমা দিয়েছিল, তাতে জুলাই সনদের বিভিন্ন প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট বাদ দেওয়া হয়। নোট অব ডিসেন্ট বাদ দেওয়াকে জামায়াত এবং এনসিপিসহ বিভিন্ন দল স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় বিএনপি।
ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে গণভোটের দিনক্ষণ ঠিক করার দায়িত্ব বর্তায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। কিন্তু মতবিরোধের মধ্যে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে সুপারিশ হাতে পাওয়ার ছয় দিনের মাথায় এসে ৩ নভেম্বর দলগুলোকে সমঝোতায় আসার আহ্বান জানায়; সময় দেয় এক সপ্তাহ।
সেদিন উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে এসে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, গণভোট কখন হবে, গণভোটের বিষয়বস্তু কী হবে, জুলাই সনদে বর্ণিত ভিন্ন মতগুলো প্রসঙ্গে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে প্রস্তাবগুলোর আলোকে জরুরি ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করে উপদেষ্টা পরিষদ।
“এসব ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজস্ব উদ্যোগে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে, সম্ভব হলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারকে ঐক্যবদ্ধ দিকনির্দেশনা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।”
এরপর গেল শনিববার ঢাকায় ‘নির্বাচনী ইশতেহারে প্রযুক্তির ব্যবহার’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “যদি রাজনৈতিক দলগুলো সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।”
আর সবশেষ সোমবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, দলগুলো মতৈক্যে পৌঁছাতে না পারায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার নিজ থেকেই একটি ‘সিদ্ধান্ত নেবে’।
এরপর বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সরকারের নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, “আমরা সকল বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোটের আয়োজন করা হবে।
“অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনের মতো গণভোটও ফেব্রুয়ারির প্রথমার্থে একইদিনে অনুষ্ঠিত হবে। এতে সংস্কারের লক্ষ্য কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হবে না।”
তার ভাষণের আগে বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে তার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক হয়। সেখানে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুমোদন পায়। পরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ওই আদেশে সই করেন বলে তার দপ্তর থেকে জানানো হয়।
গণভোটের প্রশ্নে পরিবর্তন
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে যে সুপারিশ করেছিল, তার খসড়া আদেশে গণভোটের সঙ্গে একটি প্রশ্ন রেখে তফসিল আকারে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮টি বিষয় রাখা হয়েছিল।
তাদের সুপারিশের ‘হ্যাঁ/না’ ভোটের প্রশ্ন হিসেবে ছিল, ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং ইহার তফসিল-১ এ সন্নিবেশিত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’
ওই তফসিলে ছিল, সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮টি বিষয়ে ঐকমত্য কমিশনে নেওয়া সিদ্ধান্তের তালিকা। ওই সিদ্ধান্তের মধ্যে ১৮টি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট থাকলেও তফসিলে তা রাখা হয়নি।
বৃহস্পতিবার যে আদেশ জারি করা হয়েছে, সেখানে গণভোটের প্রশ্নের মধ্যে জুলাই সনদের সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮টি বিষয়কে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে চারটি প্রশ্নে।
প্রশ্নটি হবে–
“আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?”
ক) নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ) আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
ঘ) জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।”
গণভোটের দিন এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে মত জানাবেন ভোটাররা।
‘ক’ দফায় জুলাই সনদের ৪৮টি বিষয়ের মধ্যে ছয়টিকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে, যা গণভোটে পাস হলে জুলাই সনদে যেভাবে আছে, সেভাবে গঠন করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন ছাড়া বাকি পাঁচটি ক্ষেত্রে এক বা একাধিক দলের নোট অব ডিসেন্ট থাকলেও, তা রাখা হয়নি।
অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের তালিকায় জুলাই সনদে ন্যায়পাল, সরকারি কর্ম কমিশন, মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে নিয়োগের প্রক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে।
বিএনপির বিরোধিতাকে অগ্রাহ্য করে জাতীয় নির্বাচনে দলের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ গঠনের বিধান সরাসরি করার কথা বলা হয়েছে গণভোটের প্রশ্নের ‘খ’ অংশে। উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে একমত হলেও বিএনপি চায়, নিম্নকক্ষের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অনুপাতে তা গঠিত হোক।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, গণভোটের প্রশ্নে ‘গ’ দফায় এমন ত্রিশটি বিষয়কে অন্তর্ভূক্ত করার কথা বলা হয়েছে, যেগুলোতে কোনো দলের নোট অব ডিসেন্ট নেই।
সংবিধান সংস্কারের ৪৮টি বিষয়ের মধ্যে যেগুলো প্রথম তিনটি অংশে পড়বে না, সেগুলো গণভোটের প্রশ্নে ‘ঘ’ অংশে রাখার কথা বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অসন্তোষ
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে বিএনপির মুখ সালাহউদ্দিন আহমদ তাৎক্ষণিক প্রক্রিয়ায় প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে জুলাই সনদ লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন।
কীভাবে সনদ লঙ্ঘিত হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই স্বাক্ষরিত হয়েছে, সারা জাতি দেখেছে এবং সেই স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের ছাপানো কপি সবার কাছে আছে। সেই কপিগুলোতে প্রস্তাব এবং তার বিপরীতে দলগুলোর সম্মতি এবং নোট অব ডিসেন্ট, নোট অব ডিসেন্টের ভাষা সবকিছু সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে।
“এটা কোনো প্রথাগত নোট অব ডিসেন্ট নয়, ভিন্নমত নয়। সুনির্দিষ্টভাবে যে, এই ভিন্নমত যদি দলগুলো তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ করে এবং জনগণের ম্যান্ডেট প্রাপ্ত হয় তাহলে তারা সেভাবে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নিতে পারবেন। এখন সেই জায়গা থেকে কি সরে আসা হল না? এই জন্যই আমি বলছি যে, যিনি স্বাক্ষর করেছেন, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা তিনি নিজের স্বাক্ষরিত দলিলের বাইরে গেলে সেটা লঙ্ঘনের শামিল।”
তিনি বলেন, “আমরা কয়েকদিন আগেও আমাদের দলের অবস্থান সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানিয়েছি যে, স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের বাইরের কোনো বিষয় যদি আরোপ করা হয় তার সঙ্গে আমরা একমত হব না। সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলো প্রতি সেটা কোনো বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করবে না।”
সালাহউদ্দিন বলছেন, যে প্রশ্নগুলো করা হচ্ছে, সেটা স্বাক্ষরিত সনদ বহির্ভূত। এগুলোর উপর হয় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার বিষয়টিকে তিনি জবরদস্তি মনে করেন।
সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেখানে কোনো কোনো পক্ষ খুশি হতে পারে, এমন মন্তব্য করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য। তিনি বলেন, “আমরা রাষ্ট্রের মধ্যে একটা ঐক্য সৃষ্টির পরিবর্তে কি অনৈক্য সৃষ্টি করতে যাচ্ছি? জাতীয়ভাবে কি আমরা কোনো বিভাজন সৃষ্টি করতে যাচ্ছি? এই বিভাজনের দায় দায়িত্ব কি মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা নেবেন?”
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, আগামী জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। তারা ১৮০ দিনের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবেন।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ করার এই প্রস্তাব কোনো ধরনের আলোচনা এবং ঐকমত্য ছাড়াই আদেশে যুক্ত করার কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন বলেন, “এই ধারণাগুলো কেন তিনি আদেশের মধ্যে এবং এই প্রস্তাবের মধ্যে নিয়ে আসলেন সেটা আমাদের জানা নাই।”
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা নির্বাচিত হবেন, তারা শপথ নেবেন যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্য হিসেবে, এ বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, “আর এখানে (আদেশে) প্রস্তাব করা হচ্ছে, তারা একইভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। তারা কি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন যে শপথ নিবেন?
“সুতরাং এই আইডিয়াগুলো নতুন। এভাবে একটা সময় নির্ধারণ করে দেওয়া, একটা পরিষদ নির্ধারণ করে দেওয়া, তাদের মধ্য দিয়ে সংবিধান সংস্কারের জন্য প্রস্তাব করা এবং সেটা ১৮০ দিনের ভেতরে হতে হবে, সে সমস্ত প্রস্তাব করা…এগুলোর এখতিয়ার কি আসলে কারো আছে?
এভাবে নির্দেশনা দিয়ে কোনো প্রস্তাব আইনি ভিত্তি পাবে কিনা সে প্রশ্ন রেখে সালাহউদ্দিন বলেন, “তাতে করে কি সংসদের এখতিয়ার, সার্বভৌম এখতিয়ারের উপরে কি হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না?”
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে জাতীয় নাগরিক পার্টির তরফে নতুন সংবিধান লিখতে গণ পরিষদের দাবি তোলে। গণসংহতি আন্দোলন ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন সংবিধান সংস্কার পরিষদের দাবি তোলে।
জাতীয় সনদে বিষয়টি না থাকার কথা তুলে ধরে বিএনপির এই নেতা বলেন, “যদি কোনোরকমের একটা জাতীয় ঐকমত্য হত এই যে আমরা একটা গণপরিষদ বা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করব। তখন সেই লক্ষ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংবিধান পরিবর্তন হতে হবে, নির্বাচন কমিশনকে এখতিয়ার দিতে হবে। তারপরে হতে হবে।
“এখন কি আমরা স্বাধীনতার পূর্ব অবস্থায় আছি? যে একটা গণপরিষদ করতে হবে। বাংলাদেশকে নতুন করে একটা রাষ্ট্র হল, এই রাষ্ট্র তো পুরাতন। এখানে আমাদের একটা সংবিধান আছে। সুতরাং যে সমস্ত আইডিয়াগুলো এখানে আরোপ করা হচ্ছে। এগুলো সবগুলো সাংঘর্ষিক। তারপরেও আমরা যদি জাতীয় ভিত্তিতে ঐকমত্য হতে পারতাম কোনো বিষয়ে, তাহলে এই প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হত না।”
‘সরকার ও ঐকমত্য কমিশন সংকট সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে এক ব্রিফিংয়ে একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে ধন্যবাদ দিয়েছে দলটি।
একই সঙ্গে গেল ১৭ অক্টোবর ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের ওপর জনগণের সম্মতি গ্রহণের জন্য গণভোট অনুষ্ঠানের এবং যথাশিগগিরই জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট ও উভয়কক্ষে সংখ্যানুপাতিক (পিআর) নির্বাচন পদ্ধতি চালুর দাবিসহ পাঁচ দফা দাবিতে মঙ্গলবার জামায়াতসহ আটদল ঢাকায় সমাবেশ করেছে। রোববার প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনার সমানে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলগুলো।
এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, “জনগণের যে অভিপ্রায় ছিল জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি এবং জাতীয় নির্বাচনের আগে কি কি বিষয়ে সংস্কার হল, নতুন প্রস্তাবিত জুলাই সনদ ভিত্তিতে সংবিধানের কি কি সংশোধনী প্রস্তাব যাচ্ছে, যে ৪৮টি প্রস্তাবে আমরা সর্বসম্মত হয়েছি, সাংবিধানিক সংস্কারসহ অন্যান্য সংস্কার, এগুলো জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে জাতিকে জানাতে হবে…ভোটাররা জানবেন, তার উপরে মাইন্ডসেট হবে, তারপরে তার উপরে হ্যাঁ-না মতামত দেবেন।
“একই দিনে জাতীয় নির্বাচন, একই দিনে গণভোট হলে ভোটার তো সেই জুলাই সনদ সম্পর্কে অবহিত হয়ে তিনি, ‘হ্যাঁ’/‘না’ ভোট দেওয়ার পূর্বে তিনি তো সেটা আগে বুঝবেন, মনস্থির করবেন। অথচ একই দিনেই তাকে ওই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আবার একটা প্রতীকে তার জাতীয় নির্বাচনের ভোটও দিতে হবে…এটা একটা সংকট তৈরি করবে। যে সংকটমুক্ত নির্বাচনের আশা আমরা করেছিলাম সেই সংকট রয়ে গেল।”
জামায়াত নেতা পরওয়ার বলেন, “আমরা বারবার অনুরোধ করেছি, যুক্তি দিয়েছি…এটাও আমরা বলেছি যে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ইতিহাসে কেয়ারটেকার হোক আর যত নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথাই আমরা বলি, প্রত্যেকটি নির্বাচনে কম বেশি কিছু ভোট কেন্দ্রে সহিংসতা হয়ে থাকে, বিশৃঙ্খলা হয়ে থাকে, দুই-পাঁচটা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেল, গোলাগুলি হল স্থগিত হয়ে গেল।
“একই দিনে ভোট হলে এমন ঘটনা তো যে কোন না কোন কেন্দ্রে ঘটতে পারে…পাঁচটা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেল। “তাহলে জাতীয় নির্বাচন প্রতীকের ভোট বন্ধ হল। সেইদিন গণভোটের দশাটা কি? এর কোনো জবাব নাই।”
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে এসেও সেই আবার সাংবিধানিক সংকটের আলাপ আনা হল। এটা ছিল শেখ হাসিনার খুব প্রিয় শব্দ। বলা হচ্ছে, জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করবেন, এটা খুবই দুঃখজনক। একদিকে আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি দিয়ে জুলাই সনদ স্বাক্ষর করানো হচ্ছে। এটা বাংলাদেশে একটা দীর্ঘমেয়াদী অচল অবস্থায় এনে দেবে।”
প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “এখন গণভোট অপ্রয়োজনীয়। প্রয়োজনে গণভোট হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর। উচ্চ কক্ষ হবে গরীবের হাতি পোষা। এটাও অপ্রয়োজনীয়।
“সংবিধান সংস্কার পরিষদ কোথা থেকে এল। এটা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এখন অগ্রহণযোগ্য। নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা ও অবাধ গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নাও।”
এক দিনে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন তামাশার শামিল বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম।
চরমোনাই পীর হিসেবে খ্যাত এ নেতা চাঁদপুরে এক অনুষ্ঠানে বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে এমন ঘোষণা দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল না।”