রংপুরের ব্যবসায়ী আশরাফুল হককে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ব্লাকমেইল করে ১০ লাখ টাকা আদায় করার পরিকল্পনা থেকেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি ঘটে—এমন তথ্য দিয়েছে র্যাব। ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী আশরাফুলের বন্ধু জরেজুল ইসলাম ও তার প্রেমিকা শামীমা আক্তার ওরফে কোহিনুর (৩৩)।
আজ শনিবার (১৫ নভেম্বর) কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
এক মাসের প্রেমের নাটক
র্যাব জানায়, এক মাস আগে থেকেই শামীমা মোবাইল ফোনে আশরাফুলের সঙ্গে মিথ্যা প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। উদ্দেশ্য ছিল—অন্তরঙ্গ ভিডিও ধারণ করে তাকে ব্লাকমেইল করে টাকা আদায় করা। জরেজ আগেই শামীমাকে জানান, এভাবে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া যাবে—যার মধ্যে ৭ লাখ নেবে সে নিজে এবং ৩ লাখ পাবে শামীমা।
১১ নভেম্বর রাতে ব্যবসায়ী আশরাফুল তার পাওনা টাকা আদায়ের জন্য বন্ধু জরেজের সাথে রংপুর থেকে ঢাকায় আসেন। কিন্তু পরদিন সকাল থেকে তার ফোন বন্ধ পেলে পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।
অন্তরঙ্গ ভিডিও ধারণের ফাঁদ
১২ নভেম্বর ঢাকায় এসে জরেজ-শামীমা ও আশরাফুল শনির আখড়ায় নূরপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় ওঠেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী শামীমা মালটার শরবতে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে আশরাফুলকে অচেতন করেন। এরপর বাইরে থেকে জরেজ তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করেন বলে জানায় র্যাব।
দুপুরে আশরাফুল পুরোপুরি অচেতন হলে জরেজ তার হাত বাঁধেন, মুখ স্কচটেপ দিয়ে আটকান এবং অতিরিক্ত ইয়াবা সেবনের পর হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করেন। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
২৬ টুকরো করে ড্রামে ভরানো
র্যাব জানায়, লাশ গুম করতে ১৩ নভেম্বর সকালে জরেজ বাজার থেকে চাপাতি ও দুইটি নীল ড্রাম কেনেন। লাশ ২৬ টুকরো করে ড্রামে ভরে রাখেন। পরে দুপুরে সিএনজি যোগে ড্রাম দুটি প্রথমে একটি জায়গায় নিয়ে যান; ধরা পড়ার আশঙ্কায় সিএনজি বদলে আবার যাত্রা শুরু করেন।
হাইকোর্ট এলাকায় পুলিশের টহল দেখে আতঙ্কে পানির পাম্প সংলগ্ন বড় গাছের নিচে ড্রাম দুটি ফেলে দ্রুত সেখান থেকে সায়েদাবাদে পালিয়ে যান। এরপর শামীমাকে কুমিল্লায় চলে যেতে বলেন এবং নিজে রংপুরে ফেরত যান।
১৩ নভেম্বর হাইকোর্ট এলাকায় ড্রাম দুইটির ভেতর থেকে ২৬ খণ্ডে বিভক্ত অজ্ঞাত এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে সিআইডি আঙুলের ছাপ বিশ্লেষণে নিশ্চিত হয়—লাশটি নিখোঁজ আশরাফুল হকের।
শামীমা গ্রেপ্তার, মূল রহস্য জানতে চাওয়া হবে জরেজের
১৪ নভেম্বর কুমিল্লার লাকসামের বড় বিজরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে শামীমাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৩। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী হত্যায় ব্যবহৃত দড়ি, স্কচটেপ, রক্তমাখা পোশাকসহ বিভিন্ন আলামত শনির আখড়া এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়।
র্যাব বলছে, ব্লাকমেইল করে টাকা হাতানোই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। তবে এর পেছনে কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল কি না—তা জানতে মূল আসামি জরেজুল ইসলামের জিজ্ঞাসাবাদের অপেক্ষায় আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
উল্লেখ্য, এই হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি জরেজকে ডিবি ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে।