আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হাফেজদের রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা প্রদান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।কিন্তু এই শুভ আয়োজনের নেপথ্যে বিজয়ী হাফেজদের হাতে বিভিন্ন পুরস্কারের সাথে ‘নেক্সাস’ বইটি তুলে দেওয়ার বিষয়টি প্রশাসনিক তদারকি ও উপদেষ্টা টিমের দায়িত্বশীলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, উক্ত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিজয়ী হাফেজদের হাতে ইজরায়েলি লেখক ইউভাল নোয়াহ হারারির বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘নেক্সাস’ (Nexus) উপহার হিসেবে তুলে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাটি সুধী সমাজ ও সচেতন মহলে বিস্তর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রথমত, একজন ধর্মনিরপেক্ষ ও নাস্তিক্যবাদী চিন্তাবিদ হিসেবে হারারির লেখা বইয়ের প্রধান ভিত্তিই হলো সকল ধর্মগ্রন্থ ও ঐশী বিশ্বাসকে মানুষের তৈরি ‘আখ্যান’ বা গল্প হিসেবে আখ্যায়িত করা, যা ইসলামের মৌলিক তাওহীদি আকিদা ও ওয়াহির ধারণার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। নেক্সাস’ বইয়ে হারারি ধর্মগ্রন্থগুলোকে (কুরআন, বাইবেল ইত্যাদি) মানুষের তৈরি ‘আখ্যান বা গল্প’
দ্বিতীয়ত, ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত ও আধ্যাত্মিক সাধনায় নিয়োজিত তরুণ হাফেজদের হাতে এ ধরনের লেখকের বই তুলে দেওয়া কতটা প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিযুক্ত—সেই প্রশ্ন এড়ানো কঠিন।
তৃতীয়ত লেখক একজন সমকামী এবং সমকামী অধিকারের পক্ষে সোচ্চার। তার সঙ্গী ইৎজাক ইয়াহাভকে ২০০২ সালে বিয়ে করেন এবং তারা দুজন একসঙ্গে থাকেন। ইউভাল নোয়াহ হারারি প্রকাশ্যে তার সমকামী পরিচয়ের কথা বিভিন্ন সময়ে ব্যক্ত করেছেন এবং এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের সমঅধিকার ও মানবাধিকার নিয়ে নিয়মিত মতামত প্রকাশ করে থাকেন।
এটি কি নিছকই আমলাতান্ত্রিক অসচেতনতা ও তদারকির অভাব, নাকি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পরিসরে ইসলামি মূল্যবোধকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দূরদর্শিতার ঘাটতি? রাষ্ট্রীয় কোনো সম্মাননা অনুষ্ঠানের উপহার নির্বাচন কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি সরকারের আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সংবেদনশীলতারও প্রতিফলন ঘটায়।
কোনো বিচার বিশ্লেষণেই এ কথা স্পষ্ট যে, হাফেজদের উপহার নির্বাচনের এই সিদ্ধান্তের সাথে প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে বইটির বিতর্কিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতেন—এমনটা ভাবার কোন সুযোগ খুবই কম। বইটির ভিতর তিনি পড়েছেন বলে কেউ বিশ্বাস করবে না। কিংবা তরুণ হাফেজদের কেউ এটি পাঠ করবেন কিনা তা-ও প্রশ্নবিদ্ধ। মূল সংকটটি সৃষ্টি হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের প্রোটোকল কর্মকর্তা, উপদেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাবেক সরকারের দোসর অথবা দায়িত্বহীনতার কারণে। ধর্মীয় অনুভূতির মতো একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে ভুল বা বিতর্কিত তথ্য পৌঁছানো রাষ্ট্র পরিচালনায় বড় ধরনের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার ইঙ্গিত দেয়।
নেক্সাস বইয়ের বাংলাদেশের প্রকাশক হাসান গালিব ও সম্পাদনায় রয়েছেন মুজিবুর রহমান ওরা কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে এগুলা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব উপদেষ্টাগণ রয়েছেন তারা ইতিমধ্যে ১১ দলীয় জোটকে রাজপথে নামার বিভিন্ন ইস্যু তৈরি করে দিয়েছেন। বর্তমান স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন পরিষ্কার করে বলেছেন চেয়ারপারসনের কাছে গিয়ে সত্যি কথা বলার মত বিএনপিতে কোন নেতা নেই। বর্তমান কার্যকলাপের তাই মনে হচ্ছে।
অথচ সাধারণ জনগণ ঘটনাগুলোর গভীরতা ও অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে পারলেও, রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তা কেন উপলব্ধি করতে পারছেন না বা ব্যবস্থা নিচ্ছেন না—তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন ও সংশয় থেকে যায়।
কেন নেক্সাস বইটির বিতর্কিত! তর মূল পয়েন্ট একটু আলোচনা করব_____
১. লেখক হারারির দৃষ্টিভঙ্গি__ “নেক্সাস’ বইয়ে ধর্মগ্রন্থগুলোকে (কুরআন, বাইবেল ইত্যাদি) মানুষের তৈরি ‘আখ্যান বা গল্প’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, এগুলো বড় জনগোষ্ঠীকে একত্রিত ও শাসন করার জন্য মানবনির্মিত সামাজিক নেটওয়ার্ক মাত্র। বাস্তবতা হচ্ছে ইসলামে কুরআনকে আল্লাহর অবিকৃত ও সরাসরি বাণী (ওহী) মনে করা হয়। ইসলাম বিশ্বাস করে কুরআন কোনো মানুষের রচিত গল্প বা উপন্যাস নয়, বরং এটিই চূড়ান্ত সত্য।
২. স্রষ্টা বা একাত্ববাদ (তাওহীদ) অস্বীকার
হারারির দৃষ্টিভঙ্গি– তিনি মনে করেন ঈশ্বর বা স্রষ্টার ধারণা মানুষের কল্পনার ফসল। মানুষ নিজের প্রয়োজনে সমাজ পরিচালনার জন্য ধর্মের সৃষ্টি করেছে। ইসলামের মূলভিত্তি হলো ‘তাওহীদ’ বা এক আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস। মহান আল্লাহই বিশ্বজগতের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ও লালনপালনকারী—এটিকে কল্পনা বলা ইসলামে কুফরি বা অবিশ্বাসের শামিল।
৩. নবুওয়ত ও রিসালাতকে অস্বীকার হারারির দৃষ্টিভঙ্গি__ তিনি ইতিহাস ও ধর্মকে সমাজবিজ্ঞান এবং বিবর্তনবাদের দৃষ্টিতে দেখেন, যেখানে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম বা নবীদের ঐশী পথপ্রদর্শক হিসেবে স্বীকার করা হয় না।
ইসলামের হজরত মুহাম্মদ (সা.) সহ সকল নবী-রাসূলদের আল্লাহর প্রেরিত সত্যদূত হিসেবে বিশ্বাস করা ঈমানের অন্যতম শর্ত।
৪. নৈতিকতার উৎস সম্পর্কিত বৈপরিত্য
লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি: ভালো-মন্দ বা পাপ-পুণ্যের কোনো সুনির্দিষ্ট পরম সত্তা নেই। সমাজ কীভাবে পরিচালিত হবে বা কোন নীতি মানবে তা মানুষ নিজেই নির্ধারণ করে। ইসলামে নৈতিকতা ও বিধি-নিষেধের প্রধান উৎস হলো কুরআন ও হাদিস (শরীয়াহ)। মানুষের তৈরি আইন কখনো আল্লাহর বিধানের বিকল্প হতে পারে না।
৫. জীবন ও সৃষ্টির উদ্দেশ্য হারারির লিখেন, জীবন মূলত বিবর্তনীয় দুর্ঘটনা ও জৈবিক প্রক্রিয়ার ফল।ইসলামের মানব সৃষ্টির নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে তা হলো আল্লাহর ইবাদত করা এবং পৃথিবীতে তাঁর নির্দেশ মেনে জীবন পরিচালনা করা।
___ সংক্ষেপে হারারি ধর্মকে সত্যের উৎস হিসেবে দেখেন না, বরং তথ্য ছড়ানোর এবং মানুষকে সংগঠিত করার ঐতিহাসিক মাধ্যম হিসেবে দেখেন। এই বস্তুবাদী ও নাস্তিক্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সাথে তাঁর প্রধান সংঘাত।
বইটির গুরুত্ব প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে খুবই পরিকল্পিতভাবে তাতে সন্দেহ নেই। বর্তমান বিশ্বের বিজ্ঞানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আলেম সমাজের জন্য ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও আধুনিক জ্ঞান অর্জনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতার সমন্বয়ই বর্তমান সময়ে আলেম সমাজের সফলতা ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। এমন ধারণা নিয়ে হয়তো নেক্সাস উপহার হিসেবে মনোনীত করানো হয়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করছে রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে সেই সুশীল পরিচয় এর দালাল গুলো তাদের নেটওয়ার্ক পুরোটাই সচল রয়েছে।
তবে এটা সত্য বইটিতেও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য ও দিকনির্দেশনা রয়েছে। বইটির মূল বিষয়বস্তু – “তথ্য ও সত্যের পার্থক্য বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে রোবটের মানুষ আইনসম্মতভাবে নিষিদ্ধ করা: হারারির মতে, যেভাবে জাল টাকা নিষিদ্ধ করা হয়, ঠিক একইভাবে ভুয়া বা বট চালিত নকল মানুষ/ অ্যালগরিদম চিহ্নিত করে আইনি সীমানায় আনা জরুরি।
(AI) এবং বর্তমান সংকট: ছাপাখানা বা কম্পিউটারের মতো আগের প্রযুক্তিগুলোর নিয়ন্ত্রণে মানুষ থাকলেও, AI এমন প্রথম প্রযুক্তি যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে এবং নতুন ধারণা তৈরি করতে পারে। হারারি সতর্ক করে বলেন, সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকলে AI ডিজিটাল একনায়কতন্ত্র বা এমন অ্যালগরিদমিক ব্যবস্থার জন্ম দিতে পারে যেখানে ভুল বা ভুয়া তথ্য পুরো সমাজকে বিভ্রান্ত করতে পারে। এগুলি হচ্ছে বইটির ভালো দিক।
প্রশ্ন উঠছে, কওমি মাদ্রাসা ও ধর্মপ্রাণ মানুষের সাথে প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে দূরত্ব ও বিবাদ তৈরির লক্ষ্যে কারা এই বিতর্কিত বই নির্বাচনের অপকৌশল অবলম্বন করেছিল? নাকি এটি ডিসেম্বরে ভারত থেকে পলাতক নেত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির কোনো পরিকল্পনার অংশ?”
ভারত সরকারের সরাসরি মদের পলাতক গোষ্ঠীসহ ভূ-রাজনৈতিক নানা অপশক্তি বাইরে থেকে রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে দেশকে চরম সংকট ও ক্ষতির মুখে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।
অতএব, প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে থাকা নীতিনির্ধারক ও উপদেষ্টাদের প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। জাতীয় ঐক্যের স্বার্থেই শীর্ষ নেতৃত্বকে প্রশাসনিক শিথিলতা কাটিয়ে উঠে আরও বেশি দৃঢ়, সচেতন ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকার পরিচয় দিতে হবে।