নিউজ ডেস্ক:
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিশ্বের ১০২ টি দেশের নাগরিকদের পাঠাভ্যাস নিয়ে একটি জরিপ প্রকাশিত হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়া ভিত্তিক সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন জরিপের ফলাফল বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা বই পড়ার শীর্ষে রয়েছেন। তালিকার সর্বনিম্নে রয়েছে আফগানিস্তান। বইপ্রেমীদের এই তালিকায় ১০২ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। বাংলাদেশের একজন মানুষ গড়ে বছরে তিনটির মতো বই পড়েন। আর বই পড়ার পেছনে বছরে ব্যয় করেন মাত্র ৬২ ঘণ্টা সময়। সুতরাং অমর একুশে বইমেলা শুধুমাত্র নিছক একটি উৎসবই হবেনা বরং এই মেলা আমাদেরকে আরো বইপ্রেমী করে তুলবে, নিয়মিত বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলবে, আজকের এই বই মেলায় দাঁড়িয়ে এটিই আমার প্রত্যাশা।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকালে বাংলা একাডেমিতে অমর একুশে বই মেলার উদ্ভোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
বইয়ের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ বাড়াতে হবে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাজ্য কিংবা কানাডার মতো অনেক উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরায় বলছেন, ইন্টারনেট ব্যবহারের আসক্তি পড়াশোনার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে। সময়ের প্রেক্ষিতে জনজীবনে ইন্টারনেট অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠলেও এর নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কেও আমাদেরকে সচেতন থাকতে হবে। বিশেষ করে বইয়ের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ বাড়াতে হবে।
তারেক বলেন, বাংলা একাডেমির আয়োজনে ১৯৭৮ সাল থেকে চালু হওয়া অমর একুশে বইমেলা এখন জাতীর মেধা মননের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে বইমেলা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও নিয়মের কিছুটা ব্যত্যয় ঘটিয়ে দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবার নির্ধারিত সময়ের বেশকিছু সময় পর বইমেলা শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই বইমেলার আয়োজন করা হয়। তবে আমাদের বইমেলা অন্য দেশের বইমেলার মতো নয়। আমাদের বইমেলা আমাদের মাতৃভাষার ভাষার অধিকার আদায় এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবে চিহ্নিত। তবে প্রতি বছর মেলার আকার আয়তন বাড়লেও সেই হারে গবেষণাধর্মী বই প্রকাশিত হচ্ছে কিনা কিংবা মানুষের বই পড়ার অভ্যাস বাড়ছে কিনা এই বিষয়গুলো নিয়েও বর্তমানে চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, বই পড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। জার্মান দার্শনিক ‘মারকুইস সিসেরো’র একটি উক্তি এখানে আমি খুবই প্রাসঙ্গিক মনে করছি। তিনি বলছিলেন, ‘বই ছাড়া ঘর আত্মা ছাড়া দেহের মতো।’ বিজ্ঞানী এবং গবেষকরা বলছেন, বই শুধুমাত্র বিদ্যা শিক্ষা কিংবা অবসরের সঙ্গীয় নয় বরং বই পড়া মস্তিষ্কের জন্য এক ধরনের ব্যায়াম। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি করে যেটি মানুষের স্মৃতিশক্তি এবং বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়ায়। এমনকি আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়ার মতো রোগেরও ঝুঁকি কমায়।
তিনি বলেন, তবে বর্তমান সময়ে তথ্য প্রযুক্তি মানুষের বই পড়ার অভ্যাসে প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ইন্টারনেট আসক্তি তরুণ প্রজন্মকে বই বিমুখ করে তুলছে। ইন্টারনেটেও অবশ্যই বই পড়া যায়…তবে গবেষকরা বলছেন, বইয়ের পাতায় কালো অক্ষরে লেখা বই পড়ার মধ্যে যেভাবে জ্ঞানের গভীরতা উপভোগ করা যায়, একইভাবে দিনের পর দিন কম্পিউটারের মনিটরে ডুবে থেকে জ্ঞানার্জন সম্ভব হলেও শরীর এবং মনোজগতে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রভাবও কম নয়।
তারেক বলেন, মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ৫২’ র ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে আমরা সগৌরবে প্রতি বছর অমর একুশে পালন করি। দিবসটি এখন আর শুধু বাংলাদেশের নয়। অমর একুশে এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে। ৫২ সালের ভাষা শহীদদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আজকের এই বাংলা একাডেমি। বাংলা একাডেমির সৃজনশীল কার্যক্রমের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘অমর একুশে বইমেলা’। তবে সময়ের প্রেক্ষিতে আগামী বছরগুলোতে ‘অমর একুশে বইমেলা’ ‘অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা’য় হিসেবে আয়োজন করার সুযোগ রয়েছে কিনা, সেটি আপনারা বিবেচনা করতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা’ অনুষ্ঠিত হলে বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বহু ভাষা এবং সংস্কৃতি শেখা-জানা এবং বোঝার দিকে আমাদের নাগরিকদের আগ্রহী করে তুলতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।
তিনি বলেন, আমি মনে করি, বর্তমান গ্লোবাল ভিলেজের এই সময়ে মাতৃভাষা ছাড়াও আরো একাধিক ভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়া জরুরি। বর্তমানের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সমৃদ্ধি এবং সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান এবং মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সমাজ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই. এ জন্য আমাদেরকে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-প্রযুক্তিতে মেধায় নিজেদেরকে সমৃদ্ধ হতে হবে। একইসঙ্গে বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হেসে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক এ সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়। অমর একুশে বইমেলা কেবল বই বেচাকেনার মেলা নয় বরং মেলা হয়ে উঠুক শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের সূতিকাগার।
তিনি বলেন, অমর একুশে বইমেলা কেন্দ্র করে বাংলা একাডেমি মাসব্যাপী আলোচনা অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন, সংগীত ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতার যে আয়োজন করে…এইসব উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের সামনে তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করে দেয়। এভাবেই বইমেলা হয়ে উঠুক আমাদের সকলের মিলনমেলা, প্রাণের মেলা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বইমেলা শুধু একটি নির্দিষ্ট মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সীমাবদ্ধ না রেখে সারাবছর দেশের সব বিভাগ, জেলা, উপজেলায়ও আয়োজিত হতে পারে। এ ব্যাপারে বই প্রকাশকগণও উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে পারেন বলে আমি মনে করি। এ ব্যাপারে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় আপনাদেরকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
তারেক বলেন, জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি আমাদের তরুণ-তরুণীদের মেধা ও মনন বিকাশের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। এরমধ্যে বিভিন্ন মেয়াদি গবেষণাবৃত্তি, তরুণ লেখক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন। এ ধরণের উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরপ্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও দেশজ সংস্কৃতির মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা ভবিষ্যতে আরো সম্প্রসারিত হবে ইনশাআল্লাহ। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাহিত্য ইংরেজিসহ নানা বিদেশি ভাষায় অনুবাদের কার্যক্রমও বাংলা একাডেমি পরিচালনা করছে। আমি আশা করি, এ কার্যক্রমও আরও বেগবান হবে এবং আমাদের সমৃদ্ধ সাহিত্যের সঙ্গে বিশ্ব সাহিত্যের পরিচয় আরো সুদৃঢ় করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ জন্যই আমরা বলি-সবার আগে বাংলাদেশ। এই দেশকে সকল প্রকার অন্ধকার ও পশ্চাৎপদতা থেকে মুক্ত করে দল মত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য একটি নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমি আপনাদের সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।
সবশেষে অমর একুশে বইমেলা ও একুশে অনুষ্ঠানমালা ২০২৬-এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির সভাপতি আবুল কাসেম ফজলুল হক, মহাপরিচালক অধ্যাপক আজম, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
বই মেলা উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য পদত্যাগকৃত উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান, উপ-উপাচার্য মামুন আহমেদসহ একাধিক কবি, শিল্পী ও বিশিষ্টজন উপস্থিত ছিলেন।
এ বছর বইমেলা চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ২ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত মেলা চলবে। মেলায় শিশুদের জন্য শিশুপ্রহর থাকছে। ছুটির দিন সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১ টা পর্যন্ত এই মেলায় শিশুদের জন্য বিভিন্ন বই থাকবে। এ বছর মোট ৫৪৯টি স্টল এবং ৮৭টি লিটলম্যাগ থাকছে। মেলায় বই বিক্রি হবে ২৫ শতাংশ কমিশনে।