মোঃ মাইন উদ্দিন
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামফলকে ইংরেজি ভাষা- কিন্তু বাংলা কোথায়? রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা কি কেবল বইয়ের পাতায় আর দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে?
মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের রক্তাক্ত ইতিহাস। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অগণিত ভাষাসৈনিক। সেই আত্মত্যাগেরই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এসেছে যখন ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। আর আমাদের প্রেরণার চিরন্তন প্রতীক শহীদ মিনার আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ভাষার মর্যাদার সাক্ষ্য হয়ে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই চেতনা কি আমাদের বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে?
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার সালুয়া ইউনিয়নের ডুমরাকান্দা ৫২নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে বড় করে লেখা—“52 NO DUMRAKANDA GOVERNMENT PRIMARY SCHOOL”। বাংলায় একটি শব্দও নেই কেন। যে দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা বাংলা, যে দেশের মানুষ ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, সেই দেশের প্রাথমিক শিক্ষার প্রথম প্রবেশদ্বারেই যদি মাতৃভাষা অনুপস্থিত থাকে- তবে তা কি কেবল অবহেলা, নাকি চেতনার সংকট?
প্রাথমিক বিদ্যালয় হলো শিশুর শিক্ষাজীবনের প্রথম পাঠশালা। এখানেই তারা শেখে পরিচয়, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মূল্যবোধ। বিদ্যালয়ের নামফলকই যদি বাংলায় না থাকে, তবে তা প্রতীকীভাবে হলেও ভাষার গুরুত্বকে খাটো করে। শিশুরা প্রতিদিন যে নামফলক দেখে বড় হয়, সেটিই তো তাদের মনে ভাষা ও পরিচয়ের প্রথম ছাপ রেখে যায়।
অবশ্যই বিশ্বায়নের এই যুগে ইংরেজি শেখা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তির জগতে ইংরেজি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু আধুনিকতার নামে যদি আমরা নিজের ভাষাকেই উপেক্ষা করি, তবে তা অগ্রগতি নয়- বরং আত্মপরিচয়ের অবমূল্যায়ন। মাতৃভাষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে অন্য ভাষা শেখা যায়; কিন্তু মাতৃভাষাকে সরিয়ে দিয়ে নয়।
সমাধান কঠিন নয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দ্বিভাষিক নামফলক বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে- প্রথমে বড় অক্ষরে বাংলা, নিচে সহায়ক হিসেবে ইংরেজি। এতে যেমন ভাষার মর্যাদা রক্ষা পাবে, তেমনি আন্তর্জাতিক প্রয়োজনও পূরণ হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ভাষা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে জোর দাবি- সরকারি প্রতিষ্ঠানে বাংলাকে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হোক। ভাষা আন্দোলনের চেতনা কেবল প্রভাতফেরি, ফুল দেওয়া বা বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা প্রতিফলিত হতে হবে আমাদের নীতি, প্রয়োগ ও প্রতিদিনের সিদ্ধান্তে।
পরিশেষে, সকল ভাষা শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁদের রক্তে রাঙানো বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষা করা- এই হোক আমাদের আজকের শপথ।