বাংলাদেশে এমন ভূমিকম্প হওয়ারই কথা ছিল। শুক্রবার যে ঝাঁকুনি মানুষ অনুভব করেছে, তার মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭– খুব বড় নয়, তবে জোর সতর্কবার্তা দিয়ে গেছে। রিখটার স্কেলে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও আমাদের অনেক ভবন ভেঙে পড়তে পারে। কারণ সহজ, দীর্ঘদিন বড় ভূমিকম্প হয়নি, আর বিল্ডিং কোডও আমরা মানিনি।
এই ভূখণ্ডে বড় ভূমিকম্পের নজির পুরোনো। ১৭৬২ সালের ‘গ্রেট আরাকান আর্থকোয়েক’, ১৮৯৭ সালের ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক’, ১৮৬৯, ১৮৮৫, ১৯১৮, ১৯৩০– একটার পর একটা বড় কম্পন হয়েছে এই অঞ্চলে। ঐতিহাসিক প্রবণতাও বলছে, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প ১০০ থেকে ১২৫ বছর পরপর এবং ৮ মাত্রার ভূমিকম্প ২৫০ থেকে ৩০০ বছর পর আসতে পারে। ১৯৩০ সালের পর বড় ভূমিকম্প হয়নি, মানে ঝুঁকিটা জমে আছে। গতকালের কম্পনকে তাই নিছক একটা ঝাঁকুনি নয়, সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্পের ‘ফোরশক বা পরাঘাত’ হিসেবে দেখা উচিত।
ঢাকা শহরের বিষয়টা আরও সংকটজনক। এখানে প্রায় ২১ লাখ ভবন আছে। এর মধ্যে ছয় লাখ ছয়তলার বেশি। শুক্রবার মাত্র ২০ সেকেন্ডের কম্পনে যেসব ভবন নড়ে উঠেছে বা ফাটল ধরেছে, সেগুলো ভবনের মান সম্পর্কে অনেক কিছু বলে। বিল্ডিং কোড মানা হয়নি, সেটাই স্পষ্ট।
রানা প্লাজা ধসের পর গার্মেন্ট শিল্পে ভবন পরীক্ষা করা হয়েছে, ভালো-খারাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে দেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরটির বেলায় সেটা হয়নি। অথচ রাজধানীর ভবনগুলো পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
আমাদের হিসাব বলছে, ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে যদি ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, তাহলে এক থেকে তিন লাখ মানুষ হতাহত হতে পারে। শহরের প্রায় ৩৫ শতাংশ ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা আছে।
এখনই যা করা দরকার
সব ভবন পরীক্ষা করে তিন শ্রেণিতে ভাগ করতে হবে, অনেক দেশেই এটা করা হয়েছে। ‘সবুজ’ মানে ঝুঁকিমুক্ত, ‘হলুদ’ মানে সংস্কার করা দরকার, ‘লাল’ মানে অবিলম্বে খালি করতে হবে। কোন ভবনগুলো কোড মেনে নির্মিত হয়েছে, কোনগুলো মেরামত দরকার, আর কোনগুলো বিপজ্জনক– এটা এখনই স্পষ্ট করা জরুরি।
রাজউক ভবন মালিকদের জানিয়ে দেবে, ভবন পরীক্ষা করতে হবে। মালিকরাই সনদ জমা দেবেন– কোড মানা হয়েছে কিনা। এতে সরকারের তেমন খরচও লাগবে না। বিশ্বব্যাংক এই খাতে ১৮ কোটি ডলার দিয়েছে, তবে রাজউকের সক্ষমতা এখনও সীমিত। কাজটা দ্রুত গোছানো প্রয়োজন।
ঢাকা শহরে ছয় লাখের মতো মাঝারি থেকে উঁচু ভবন আছে। বড় ভূমিকম্প হলে এগুলোর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। একেকটা বড় ভবন ধসে পড়লে কী অবস্থা হয়, সেটি আমরা রানা প্লাজায় দেখেছি। গতকালের কম্পন আবার সেই স্মৃতি টেনে তুলল।
৫ দশমিক ৭ মাত্রার কম্পনে যখন ফাটল ধরছে, ৭ মাত্রা হলে কতটা ক্ষতি হবে– এটা অনুমান করা কঠিন নয়। একমাত্র উপায় হলো প্রস্তুত থাকা, ভবনগুলো পরীক্ষা করা, ঝুঁকিপূর্ণগুলো চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। ভূমিকম্প আমরা ঠেকাতে পারব না। তবে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এখনই কাজ শুরু করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।
লেখক: অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়