শেখ হাসিনা-আসাদুজ্জামান খান কামালের মতো আরও মৃত্যুদণ্ডাদেশ, বিভিন্ন দণ্ড, নিপীড়ন, নির্যাতনকে রাজনীতির সহানুভূতির হাতিয়ার হিসেবে নিয়ে এগোচ্ছে বিতাড়িত আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনাসহ বাইরে থাকা নেতৃত্ব থেকে দেশে থাকা নেতাকর্মী-সমর্থকদের কাছে এমন নির্দেশনাই আসছে। ধানমন্ডি বত্রিশ, ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউসহ বিভিন্ন জায়গায় নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে হামলার ভিডিও ফুটেজ বিশেষভাবে সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে। এতে দলটির প্রতি কম-বেশি সহানুভূতি তৈরি হচ্ছে বলে বিশ্বাস তাদের। চলতি দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালের পর তৃতীয় ট্রাইব্যুনাল হবেÑসেই অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে তাদের। এর আগে একাত্তরের গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচারে ট্রাইব্যুনাল হলেও সব বিচার শেষ হয়নি।
ক্ষমতার পালা বদলালে ৫ আগস্টের পরও এখানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে তৃতীয় দফায় ট্রাইব্যুনালে বিচারের উপাদান তৈরি করে রাখতেই এমন আশাবাদ ও নির্দেশনা। চলমান ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা বা তার দলের আরও নেতা ভবিষ্যতে দণ্ডিত হবেন-এমন প্রস্তুতিও রয়েছে তাদের। যার ক্ষেত্র প্রস্তুতে সম্প্রতি ৫ আগস্টের বিপ্লবের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত থাকার অভিযোগ হঠাৎ অস্বীকার করেছেন শেখ হাসিনা। এর পেছনে রয়েছে একটি চিকন কূটনীতি-রাজনীতির চাল। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের জাল ফেলা হয়েছে।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য বাংলাদেশে ২০১০ সালের মার্চে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যেসব রাজনৈতিক নেতাকে ফাঁসি দিয়ে যে রেকর্ড তৈরি করেছে, সেখানে নতুন মাত্রা যোগ করার বাসনা নিয়ে আরও অনেক স্বপ্ন তাদের। টুকটাক সায়ও মিলছে। এবার রায় ঘোষণার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা বিষয়টিতে অবগত রয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, নিকট প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশে শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি ও স্থিতিশীলতাসহ বাংলাদেশের জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থ সুরক্ষায় ভারত অঙ্গীকারাবদ্ধ। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা সকল অংশীজনের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত থাকতে চায়। রায়ের পর বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংঘাত প্রতিরোধ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ-আইসিজি। সংস্থাটির বাংলাদেশ-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরামর্শক থমাস কিন এই রায় এবং এর সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে একটি বিশদ বিশ্লেষণমূলক মন্তব্য প্রকাশ করেছেন। সেখানে বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘোষিত রায়টি বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে স্বাগত হয়েছে। ধীরে ধীরে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবী শক্তির স্বপ্ন বাস্তবায়ন হচ্ছে। দেশবিরোধী শক্তির পতন হচ্ছে। এর কিছুটা বিপরীত অবস্থান জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ আন্তর্জাতিক কিছু সংস্থার। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালের বিচার ন্যায়সংগত হয়নি। সবদিকেই একটু একটু বলা এসব সংগঠনের বৈশিষ্ট্য। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে হাসিনার বিচারকে স্বাগত জানিয়েছে। আবার মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতাও করেছে। আইসিজি বলেছে, হাসিনার বিচারে রায়ের রাজনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। মৃত্যুদণ্ডে মানবাধিকার লঙ্ঘন বেড়ে যায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, মৃত্যুদণ্ডে ন্যায্য বিচার হয়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনার-ওএইচসিএইচআর দপ্তরের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি বলেছেন, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ডের রায় গত বছর গণ-অভ্যুত্থানের সময় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভুক্তভোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক আশা প্রকাশ করেছেন, বাংলাদেশ সত্য প্রকাশ, ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচারের একটি সমন্বিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় ঐক্য ও ক্ষত কাটিয়ে ওঠার দিকে এগিয়ে যাবে। এ প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা খাতের অর্থবহ ও রূপান্তরমূলক সংস্কার অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত। আর এ সংস্কার হবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, যেন আর কখনো মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের ঘটনা না ঘটে। আইসিজির বাংলাদেশ-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট থমাস কিয়ানের বিবৃতিতে শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করার রায় প্রশংসিত হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ বিবৃতিতে আরও বলেছে, এ রায়ের ফলে শেখ হাসিনার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরে আসার সম্ভাবনা এখন খুব কম। তিনি যত দিন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি না হচ্ছেন, তত দিন দলটির রাজনীতির ময়দানে ফেরা সহজ হবে না। এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের তথ্য-অনুসন্ধান প্রতিবেদনে গত বছর বিক্ষোভ-সহিংসতায় ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যার যে তথ্য দেওয়া হয়, সেটি উল্লেখ করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ। এ বিচারপ্রক্রিয়া সমালোচনার বাইরে নয় উল্লেখ করে আইসিজি বলেছে, ‘আসামির অনুপস্থিতিতে হওয়া বিচার প্রায়ই বিতর্কের সূত্রপাত করে। এ মামলার ক্ষেত্রে যে দ্রুততার সঙ্গে শুনানি হয়েছে, সেটা এবং বিবাদী পক্ষের স্পষ্টত সুযোগ-সুবিধার ঘাটতিও সুষ্ঠু বিচার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। এ ধরনের দ্বিমুখী হরেক ঢোলের বোলে আওয়ামী লীগের আশা জাগছে, মনও ভাঙছে।
এদিকে উপদেষ্টা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বিভিন্নজন খুব গুরুত্ব দিয়ে শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে দেশে আনার ব্যাপারে কড়া কড়া কথা বলছেন। এ ক্ষেত্রে তাদের ভরসা ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে অপরাধী প্রত্যার্পণ চুক্তি। যা স্বাক্ষর হয় আওয়ামী লীগের গত সরকারের আমলে, ২০১৩ সালে। ওই প্রত্যার্পণ চুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা আছে, তা হলো, যাকে হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে অভিযোগটা যদি ‘রাজনৈতিক প্রকৃতি’র হয়, তাহলে সেই অনুরোধ খারিজ করা যাবে। মানে শেখ হাসিনাকে ফেরানোর সেই স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে না বাংলাদেশের। উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, তৌহিদ, প্রেস সচিব শফিকুল আলম এমনকি স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসও ফেসবুকে পোস্ট বা সরাসরি চিঠি দিলেন আর নরেন্দ্র মোদির সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে পাঠিয়ে দেবেÑতা এত সোজা নয়। মোটকথা, সেই ৫ আগস্ট ২০২৪ সাল থেকে আজতক ভারত তাকে যে আশ্রয় বা আতিথেয়তা দিচ্ছে, তা অবিকল বহাল থাকছে।
এ নমুনা বুঝে শেষ বয়সে ঢোলের নতুন বাদক হয়েছেন একসময়ের আওয়ামী লীগ নেতা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। পঁচাত্তরের আগস্ট ট্র্যাজেডির আগে থেকেই ভারতের নানা অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন, দীর্ঘদিন ভারতে লালন-পালনে বড় হওয়া কাদের সিদ্দিকী পুরান বয়ান নতুন করে বলেছেনÑযারা বলেন, শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন, ব্যাকরণগত দিক থেকে এটাকে আমি মানি না। শেখ হাসিনা পালাননি। শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে এখান থেকে ভারতে পাঠানো হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস একজন জঘন্য লোক, তা অনেক আগেই চিনেছেন বলে শেখ হাসিনাকে একটা ধন্যবাদও দিয়েছেন কাদের সিদ্দিকী। আনন্দবাজারসহ ভারতের কিছু গণমাধ্যমও এ কাজে মহাব্যস্ত। কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দেখাশোনা, আতিথেয়তাও আরও জোরদার হয়েছে।
এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে ঢাকায় বেড়েছে কূটনৈতিক তৎপরতা। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি পূর্ণ সমর্থন রাখছে ইইউসহ আন্তর্জাতিক মহল। শুধু তা-ই নয়, প্রধান উপদেষ্টার প্রতি শতভাগ আস্থা রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি কড়া বার্তাও দিয়েছেন এসব আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা। তা ছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক সংস্কার এবং গণভোট নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অবস্থানের প্রতি গভীর পর্যবেক্ষণ রাখছেন এসব কূটনীতিক। মাঝেমধ্যেই বসছেন এখানে-ওখানে। তারা আসলে কোন টিমে খেলছেন, তা এখনো ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।