ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। এ নির্বাচনে বিএনপি ২০৯ ও জামায়াত ৬৮ আসন পেয়েছে। দলটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৯১ সালে সর্বোচ্চ ১৮টি আসন পায়। এরপর তিনটি নির্বাচনে অংশ নিলেও এবারই সর্বোচ্চ আসনে জয় পায় জামায়াত। দলটির ধারাবাহিক রাজনৈতিক সাফল্যের ফলে বিশালসংখ্যক আসন পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জানা যায়, জামায়াতে ইসলামী ১৯৯১ সালে ১৮টি আসনে জয় পেয়েছিল। এরপর ১৯৯৬ সালে ৩টিতে জয় পায়। ২০০১ সালে বিএনপি জোটের অংশ হিসেবে দলটি ১৭টি ও ২০০৮ সালে মাত্র ২টি আসনে জয় পায়। এরপর দীর্ঘ সময় তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আদালতের রায়, দমনপীড়ন এবং সংগঠনগত সংকটের কারণে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়। সেই প্রেক্ষাপটে এ নির্বাচন তাদের জন্য নিঃসন্দেহে পুনরাগমনের। আসনের সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। দলটি এবার ৬৮টি আসন পেয়েছে। তবে বিগত সময়ে তারা জোটের সঙ্গী থাকলেও এবার দলটি জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জামায়াত এবারের নির্বাচনে ২২৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। এর মধ্যে ৬৮টিতে জয় পেয়েছে দলটি। শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত রয়েছে। বাকি আসনগুলো হারের কারণ খুঁজছে দলটি। যদিও জামায়াতের হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান জয়ী হয়েছেন। তবে সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার হেরেছেন। তিনি খুলনা-৫ আসন থেকে নির্বাচন করে বিএনপির মোহাম্মদ আলী আসগর লবীর কাছে ২ হাজার ৭০২ ভোটে পরাজিত হয়েছেন। এ ছাড়া হেভিওয়েট প্রার্থী কক্সবাজার-২ আসনে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বিএনপির আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজের কাছে প্রায় ৩৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জ-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শিশির মনির হেরেছেন বিএনপির নাসির উদ্দিন চৌধুরীর কাছে। এ ছাড়া আরও ১৯ আসনে নিশ্চিত জয়ের সহজ লক্ষ্য ছিল। কিন্তু সেগুলোতে পরাজিত হয়েছে বলে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সূত্রে জানা যায়। তাঁরা বলছেন, পঞ্চগড়-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. শফিউল আলমের আসন নিশ্চিত ধরে রাখা হয়েছিল। একই সঙ্গে গাইবান্ধা-৪ আসনটির জয়ও নিশ্চিত ধরা হয়েছিল। সেখানে ৩ হাজার ভোটে হেরেছে। এ ছাড়া বিএনপির ঘাঁটিতে ভাগ বসাতে চেয়েছিল জামায়াত। দলটি ধরে নিয়েছিল বগুড়া-৩ ও ৪ আসনে নিশ্চিত জয়ী হবে। যদিও এ দুই আসনে কম ব্যবধানে হেরেছে। একই সঙ্গে পাবনা-২ আসনে মো. হেসাব উদ্দিন ও পাবনা-৫ মো. ইকবাল হোসাইন, খুলনা-১-এ কৃষ্ণ নন্দী, ঝালকাঠি-১-এ ড. ফয়জুল হক, পিরোজপুর-২-এ শামীম সাঈদী, ময়মনসিংহ-৫-এ অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, ঢাকা-৭-এ মো. এনায়েত উল্লা, সিলেট-৬-এ ঢাকা উত্তরের আমির মো. সেলিম উদ্দিন, কুমিল্লা-২-এ নাজিম উদ্দিন মোল্লা, কুমিল্লা-৫-এ ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ড. মোবারক হোসাইন, কুমিল্লা-১০-এ ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ ইয়ছিন আরাফাত, চট্টগ্রাম-২-এ মোহাম্মদ নুরুল আমিন, চট্টগ্রাম-১৬-এ মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, কক্সবাজার-৩-এ শহীদুল আলম বাহাদুরের আসনটির জয়ও নিশ্চিত ধরে রাখা হয়েছিল। এসব আসনে হারের কারণ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জামায়াত নেতা বলেন, ‘হারের কারণ খুঁজতে বসেছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। তাঁরা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করছেন। তবে কিছু আসনে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, কিছু আসনে অব্যবস্থাপনা, আবার কিছু আসনে এজেন্টের সংকট থাকায় এসব হেরেছে বলে উঠে এসেছে। বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।’
ঢাকা সিটিতে সফল জামায়াত : সবচেয়ে সফল হয়েছে ঢাকা মহানগরীতে। দলটি মহানগরীর ১৬ আসনের মধ্যে ছয়টিতে জয় পেয়েছে। সেগুলো হলো ঢাকা-৪, ৫, ১২, ১৪, ১৫ ও ১৬। এ ছাড়া জোটের প্রার্থী এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলামও জয় পেয়েছেন। দলটি এর আগে ঢাকা শহরে কখনো আসনে জয় পায়নি। এ ছাড়া দলটি সবচেয়ে বেশি ভালো ফল করেছে রংপুর ও খুলনা বিভাগে। খুলনা বিভাগে ৩৬ আসনের মধ্যে ২৫টিতে জয় পেয়েছে।
১১-দলীয় জোটের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা : সারা দেশে ১১-দলীয় জোটের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা এবং বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। গত রাতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় অফিসে অনুষ্ঠিত ১১-দলীয় জোটের বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন। এ সময় এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকসহ ১১ দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। জামায়াত আমির বলেন, ‘অতি দ্রুত এ ধরনের হামলা বন্ধ করতে হবে।’
নেতা-কর্মীদের সুরক্ষা দিতে হবে। আমরা দেশে শান্তিপূর্ণ রাজনীতি চাই। তারা এভাবে হামলা করলে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট হবে।’