প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ইয়ার ইয়াবস। রবিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
রবিবার বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, সাক্ষাৎকালে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ক্যাম্পেইন (প্রচার) করছে ও করবে এবং এর বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করবে। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আইনি পরামর্শ নিয়েছিল এবং এই টপ লিগ্যাল এক্সপার্টরা লিখিতভাবে জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকার হ্যাঁ ভোট চাইতে এ বিষয়ে কোনো আইনি প্রতিবন্ধকতা নেই।
শফিকুল আলম জানান, ইইউ পর্যবেক্ষক দলের প্রধানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে আওয়ামী লীগ বিষয়ে বা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে কোনো ধরনের কোনো আলোচনা হয়নি। গণভোট নিয়ে কথা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় রিফর্ম এজেন্ডা বাস্তবায়ন হবে। মিশন প্রধান বলেছেন, তাদের যে মিশন এটা এখন দেশের সর্বোত্র ছড়িয়ে পড়বে। তারা সব জায়গাকে মনিটর করবে, বড় বড় পলিটিক্যাল পার্টির সঙ্গে কথা বলবে। অন্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কথা বলবে।
প্রধান উপদেষ্টার বরাত দিয়ে প্রেস সচিব জানান, আমাদের প্রধান উপদেষ্টা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আশ্বস্ত করেছেন, আগামী নির্বাচন এবং গণভোট খুব সুচারুভাবে সম্পন্ন হবে। এটা অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ এবং এটা একটা ফেস্টিভ (উৎসবমুখর) ইলেকশন হবে। তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বচন কমিশন পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত আছে নির্বাচন ও গণভোটের জন্য, যাতে এটা সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়।
প্রেস সচিব জানান, প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেছেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের জন্য সমান থাকবে। এটা নিয়ে তিনি কোনো সমস্যা দেখছেন না। তিনি বলেছেন, এটা তেমন কোনো সমস্যা হবে না। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠানোর জন্য। এটা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধান বলেছেন, দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ভোটিং সেন্টারগুলোতে বডি অর্ন ক্যামেরা থাকবে। সিকিউরিটি ফোর্সের কাছে বডিতে লাগানো থাকবে ক্যামেরা, ওইটা দিয়ে মনিটর করা যাবে যে, কোথাও কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না। কোনো ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোথাও অবনতি হচ্ছে কি না এবং এটা কেন্দ্রীয়ভাবে একটা অ্যাপের মাধ্যমে যুক্ত থাকবে। ফলে সব উপজেলা, জেলা ডিভিশন এবং একদম ঢাকা থেকেই খুব সহজে মনিটর করা যাবে কোথায় কী হচ্ছে। সব সেন্টারে সিসিটিভি থাকবে। এর ফলে খুব দ্রুত অপরাধীদের আইডেন্টিফাই (শনাক্ত) করা যাবে এবং সেনাবাহিনী থাকবে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে, র্যাপিড রেসপন্স স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে থাকবে তারা, তখনই র্যাপিড রেসপন্স করতে পারবেন।
প্রেস সচিব আরও জানান, প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, দেশের সর্বত্র এখন নির্বাচনের জোয়ার চলছে। তবে ফরমাল ক্যাম্পেইন শুরু হবে। আপনারা জানেন, জানুয়ারির ২২ থেকে ফরমাল ক্যাম্পেইন শুরু হবে। তিনি আরও বলেছেন, ইইউর পর্যবেক্ষক পাঠানোর অর্থ হলো, বাংলাদেশের নির্বাচনের জন্য একটা বড় এনডোর্সমেন্ট এবং এটা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। নির্বাচনের জন্য তিনি বলেছেন, বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে, যে ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে খুব ব্যাপক মিসইনফরমেশন (ভুলতথ্য), ডিসইনফরমেশন (অপতথ্য) ছড়ানো হচ্ছে এবং এখানে এটা দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতা উস্কে দেওয়া হচ্ছে, তা ছাড়া পতিত স্বৈরাচারের লোকেরা ইলেকশন বানচালের চেষ্টা করবে। তবে সিকিউরিটি ফোর্সেস পুরোপুরি রেডি থাকবে, যে কোনো চ্যালেঞ্জ ফেস করার জন্য। তারা অলরেডি রেডি আছে, প্রফেসর ইউনূস বলেছেন, তরুণদের মধ্যে ভোটের জন্য খুবই আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সরকার কোনো দলকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে না ॥ সরকার কোনো দলকে কোনো ধরনের এক্সট্রা প্রিভিলেজ বা বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্যের জন্য আপনারা নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্ন করতে পারেন, তবে সরকারের অবস্থান নিরপেক্ষ।’
নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে শফিকুল আলম বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন এবং সরকার মনে করে এখন যথেষ্ট ভালো পরিবেশ আছে। ছোট-বড় সব রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী কার্যক্রম ও সুযোগগুলো যথাযথভাবে ব্যবহার করছে। আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে যখন আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হবে, তখন সবার জন্য সমান সুযোগের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।’
এদিকে সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আসন্ন নির্বাচনের জন্য একটি আদর্শ ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগ বিদ্যমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও তৎপর।
শফিকুল আলম বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে তিনটি বিশাল ইভেন্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছে। ইনকিলাব মঞ্চের শরীফ ওসমান বিন হাদির জানাজা, দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে বিশাল র্যালি এবং বেগম খালেদা জিয়ার জানাজাÑ এই প্রতিটি অনুষ্ঠানেই রেকর্ডসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিল। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই এ কর্মসূচি সম্পন্ন হওয়া প্রমাণ করে যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও মনোবল এখন যথেষ্ট চাঙ্গা।’
দেশে বিচ্ছিন্নভাবে ঘটা কিছু অপরাধমূলক কর্মকা-ের বিষয়ে প্রেস সচিব বলেন, ‘আমরা প্রতিটি ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মোসাব্বির হত্যাকা-ে মূল শূটার জিনাত ও পরিকল্পনাকারী বিল্লালসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া ময়মনসিংহের ভালুকায় শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকা-ের ঘটনায় নেতৃত্বদানকারী ইয়াছিন আরাফাতসহ ডজনের বেশি অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।’