বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের নিচতলার ৮ নম্বর ওয়ার্ড। ৪ নম্বর শয্যায় শুয়ে আছে আট মাসের ইনাইয়া। প্রথমে জ্বর, পরে হাম। এরপর নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্ট। এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি শিশুটি। মেয়েকে বাঁচাতে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় ছুটে এসেছে তার পরিবার। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে হয়েছে চিকিৎসা। কখনও ভর্তি, কখনও বাড়িতে সব মিলিয়ে প্রায় দুই মাস ধরে চলছে চিকিৎসা। অভাবের সংসারে এর মধ্যে খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা।
ফরিদপুর সদর উপজেলার ইনাইয়ার নানি আছিয়া বেগম বলেন, চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে ঘরবাড়ি ও সংসারের জিনিসপত্র বিক্রি করতে হয়েছে। সামনে চিকিৎসা চলবে কীভাবে, সেটিই এখন তাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা। তিনি বলেন, আমরা তো কৃষক মানুষ। আমাদের তো জানে কুলাইতেছে না। ঘরবাড়ি ও জিনিসপত্র বিক্রি করতে হয়েছে।
গত ১৫ জুন অসুস্থ হওয়ার পর প্রথমে ফরিদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ৯ দিন চিকিৎসা নেয় ইনাইয়া। সেখানে এক্স-রেসহ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। কিছুটা সুস্থ মনে হওয়ায় তাকে বাড়িতে নেওয়া হয়। কিন্তু বাড়িতে যাওয়ার পর আবার জ্বর আসে। শরীরে লাল লাল দাগ ওঠে। আবার তাকে ফরিদপুরের ওই হাসপাতালে নেওয়া হয়।
চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পর প্রথমে হামের উপসর্গকে মশার কামড় বলা হয়েছিল। পরে শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। শিশুটির বুক দ্রুত ওঠানামা করছিল। দম নিতে পারছিল না। চিকিৎসক জানান, অক্সিজেন লাগবে। পরে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন। শেষ পর্যন্ত ইনাইয়াকে ঢাকায় আনা হয়।
২৫ জুলাই বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ইনাইয়াকে। শুরু হয় নতুন করে চিকিৎসা। ভর্তি, বেড, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ; সব মিলিয়ে প্রতিদিন বাড়তে থাকে খরচ। এর মধ্যে শিশুটির পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ) প্রয়োজন হয়। তবে শিশু হাসপাতালে তাৎক্ষণিক জায়গা না পাওয়ায় সাত দিন একটি বেসরকারি হাসপাতালে রাখতে হয়। সেখানে খরচ হয় দুই লাখ টাকা।
পরে আবার শিশুটিকে বাড়ি নিয়ে যেতে বলা হয়। কিন্তু ইনাইয়ার অবস্থা দেখে তারা রাজি হননি। আছিয়া বেগম বলেন, ইনাইয়ার কান্নার আওয়াজ নেই, বুক ওঠানামা করতেছে। আমি কই– না স্যার, আমার নাতনি এখনও সুস্থ হয় নাই। আমি আর বাড়ি নেব না। এরপর আবার তাকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসেন তারা।
আছিয়া বেগম জানান, শুধু বেডের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হচ্ছে। কোনো কোনো দিন পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেই খরচ হয়েছে ২ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে দিনে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে।
ইনাইয়ার বাবা সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তাঁরও বৈধ আকামা নেই। নিজের খরচ চালানোই কঠিন। তবু সন্তানের চিকিৎসার জন্য যতটা পারেন টাকা পাঠাচ্ছেন। ইনাইয়া এখনও সুস্থ হয়নি। তাই টাকা কোথা থেকে আসবে, তা না জেনেই চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে পরিবার। চিকিৎসার টাকা নিয়ে মোবাইল ফোনে ইনাইয়ার দাদার সঙ্গে তার নানাকে বাগ্বিতণ্ডায় জড়াতেও দেখা যায়।
গয়না বিক্রি করে মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে
একই ওয়ার্ডের ১৫ নম্বর শয্যায় দুই বছরের মরিয়ম। পাশে বসে আছেন তাঁর ২০ বছর বয়সী মা লামিয়া বেগম। মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। কবে বাড়ি ফিরবেন, জানেন না। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে গত ১১ আগস্ট মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন লামিয়া। পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে আছেন। এর মধ্যে চিকিৎসায় খরচ হয়েছে ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা।
মরিয়মের বাবা এলাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তার মা লামিয়া বলেন, চিকিৎসা করার মতো আমাদের এত টাকা-পয়সা নাই। মরিয়মের হাম শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া তার শারীরিক নানা সমস্যা আগে থেকেই ছিল। জন্মের পর থেকেই খিঁচুনি হয়। বসতে বা দাঁড়াতে পারে না। ঘাড় সোজা করে রাখতে পারে না। নিজে থেকে শরীরও উল্টাতে পারে না।
মেয়ের চিকিৎসার জন্য এর আগে দুবার শিশু হাসপাতালে এসেছিলেন লামিয়া। কিন্তু বেড না পেয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল। এবার হাম হওয়ায় আবার হাসপাতালে আসতে হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরকারি হাসপাতালেও চিকিৎসা করিয়েছেন তিনি।
মরিয়মকে হাম প্রতিরোধের টিকা দেওয়া হয়েছিল কিনা, জানতে চাইলে লামিয়া বলেন, জন্মের পর থেকেই অসুস্থ থাকায় মেয়েকে টিকা দেওয়া হয়নি।
মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে হাসপাতালে আসার সময় নিজের কানের সোনার গয়না বিক্রি করেছেন লামিয়া। তা থেকে পেয়েছেন ২৫ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়েই চলছে চিকিৎসা। এখন সেই টাকাও প্রায় শেষ। মরিয়মের আরও চিকিৎসা লাগবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। কত দিন হাসপাতালে থাকতে হবে, তাও জানেন না লামিয়া।
মেয়ের শয্যার পাশে বসে তিনি বলেন, অনেক দিন হয়ে গেছে, টাকাও একদম শেষ হয়ে আসছে। এরপর তাঁর অনুরোধ, একটি বিনা মূল্যের শয্যার ব্যবস্থা হলে ভালো হতো।
হাসপাতালে ভিড়
শিশু হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিতে আসা পরিবারের দুর্ভোগ শুধু হামের রোগীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হাসপাতালের করিডোর, ভবনের বাইরে গাছতলা কিংবা ফটকের সামনে; সবখানেই দেখা যায় রোগী ও স্বজনের ভিড়।
সোমবার বেলা ১১টার দিকে সরেজমিন দেখা যায়, চেয়ারে জায়গা না পেয়ে অনেকে মাটিতে বসে আছেন। কোলে অসুস্থ শিশু নিয়ে অপেক্ষা করছেন অভিভাবকরা। এক শিশুর মা বলেন, ‘জ্বর হলেই ভয় লাগে– ডেঙ্গু বা হাম হলো কিনা। এমন আতঙ্কেই মূলত এখন হাসপাতালে আসছি।
বরিশাল থেকে ৬ বছরের আবু সাঈদকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন তার বাবা। শিশুটির নিউমোনিয়া হয়েছে। চিকিৎসক ভর্তি দিয়েছেন। কিন্তু বেড খালি না হওয়া পর্যন্ত করিডোরেই অপেক্ষা করতে হচ্ছে। শিশুটির বাবা বলেন, সিট তো দেয় না। লোক থাকলে কথা বলে নেওয়া যায়।
দিশেহারা পরিবার
হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় পরিবারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষ না হতেই অন্য হাসপাতালে নিতে হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ সমকালকে বলেন, হামের চিকিৎসায় যে খরচ হচ্ছে, তা পরিবারের আর্থিক অবস্থা যা-ই হোক, অসহনীয় হয়ে উঠছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে হামের জন্য আলাদা জরুরি সেল করা যেতে পারে। করোনার সময়ের মতো একটি জরুরি ফোন নম্বর চালু করা দরকার।
শিশু হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার বহির্বিভাগে রোগী এসেছিল ১ হাজার ২১৮ জন। হাসপাতালে হাম নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৭৩ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৯৮ জন। এ পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছে ২ হাজার ২৭৬ জন। মারা গেছে ২১ জন। হামের টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি এমন ৪৫০ শিশু হাম আক্রান্ত হয়ে এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, আমরা স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। তবে আমাদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সরকারের বরাদ্দ বাড়াতে হবে। যথাযথ চিকিৎসা সরকারি হাসপাতালে নিশ্চিত করতে হবে।