সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সম্পর্ক নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে এই দুই দেশ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই পরিচিত। তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে সেই সম্পর্ক এক নতুন গুণগত স্তরে পৌঁছেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে স্বাক্ষরিত ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সৌদি–পাকিস্তান সম্পর্ককে নিছক বন্ধুত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা জোটে রূপ দিয়েছে—যার প্রভাব শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও গভীরভাবে পড়তে পারে।
এই চুক্তির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও আলোচিত দিক হলো—এটি কার্যত সৌদি আরবের ওপর পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধ ছাতা বিস্তারের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দেন, প্রয়োজনে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য “উপলব্ধ করা যেতে পারে।”
একই সময়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এক সৌদি কর্মকর্তা জানান, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি—যা প্রচলিত ও অপ্রচলিত সব ধরনের সামরিক সক্ষমতাকে অন্তর্ভুক্ত করে।
এই নিরাপত্তা জোট এমন এক সময়ে আবির্ভূত হয়েছে, যখন মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া—উভয় অঞ্চলই চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গাজা যুদ্ধ, ইয়েমেন সংঘাত, ইরান–ইসরাইল উত্তেজনা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা ও সীমান্ত উত্তেজনা বিশ্বব্যবস্থাকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলেছে।
ঐতিহাসিকভাবে এসব অঞ্চলের বহু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল থাকলেও, ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন ও বৈদেশিক নীতির অস্থিরতা সেই নির্ভরতার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।
এই বাস্তবতায় অনেক দেশই এখন আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বিকল্প নিরাপত্তা জোট গঠনের পথে হাঁটছে—যা বিশ্লেষকদের মতে এক ধরনের “কৌশলগত বীমা ব্যবস্থা।” সৌদি–পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি এই প্রবণতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
যদিও চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি, পাকিস্তান সরকারের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন—এই চুক্তির অধীনে “যেকোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে উভয় দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে।”
এই বক্তব্য স্পষ্টতই ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫–এর স্মৃতি জাগায়, যেখানে একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর হামলাকে সম্মিলিত সামরিক প্রতিক্রিয়ার ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।
তবে এখানেই নিহিত রয়েছে মৌলিক পার্থক্য ও সম্ভাব্য ঝুঁকি। ন্যাটো একটি দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ফল—যেখানে সংসদীয় নজরদারি, স্বাধীন গণমাধ্যম ও বিচারব্যবস্থা সামরিক সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
বিপরীতে, সৌদি আরব একটি পরম রাজতন্ত্র এবং পাকিস্তান কার্যত সেনাশাসননির্ভর রাষ্ট্র—যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল এবং পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রায়ই জনজবাবদিহির বাইরে গৃহীত হয়।
এই বাস্তবতায় সৌদি–পাকিস্তান নিরাপত্তা জোটে কার্যকর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা স্পষ্ট নয়। চুক্তির ভাষা অত্যন্ত নমনীয়, “যেকোনো আগ্রাসন” শব্দগুচ্ছের ব্যাখ্যা রাজনৈতিক প্রয়োজনে সহজেই প্রসারিত করা যেতে পারে। কোথায় লালরেখা টানা হবে, কিংবা কোন পরিস্থিতিতে পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্রিয় হবে—সে বিষয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই।
ফলে এই জোট একদিকে যেমন সৌদি আরবের জন্য একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা তৈরি করছে, অন্যদিকে তেমনি এটি পাকিস্তানকে এমন এক ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে, যার পরিণতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। নতুন এই শক্তি প্রদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ঝুঁকিও জন্ম নিচ্ছে—যার অভিঘাত মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ভারসাম্যকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে।