আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিতর্কিত বক্তব্য এবং ইতিহাস নিয়ে নতুন করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। এতে বিভিন্ন মহলে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। বিশিষ্টজনরা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের অর্জন রক্ষা এবং জাতির সঠিক দিকনির্দেশনা নিশ্চিত করতে বিতর্ক নয়, বরং সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস চর্চা জরুরি। কারণ স্বাধীন বাংলাদেশে সবার ওপরে মুক্তিযুদ্ধ। অর্থাৎ বাংলাদেশের অস্তিত্বের মূলে রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধ, এরপর সবকিছু।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন মহান স্বাধীনতা। স্বাধীনতার চেয়ে বড় কিছু নেই। স্বাধীনতার ইতিহাসে যার যা অবদান তা নিঃসংকোচে স্বীকার করতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ও শহীদ জিয়াউর রহমানের ঘোষণায় নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। এ জনযুদ্ধের শহীদদের যথাযথ সম্মান করতে হবে। একইভাবে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থান ও চব্বিশের ফ্যাসিস্ট বিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পাবে তার প্রয়োজনীয় মর্যাদা। কোনো ব্যক্তিবিশেষকে অস্বীকার করতে গিয়ে স্বাধীনতা-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকে বিকৃত করার কোনো সুযোগ নেই। এটাও ঠিক বাংলাদেশের পুরোনো চার মূলনীতি আগেও সুষ্ঠুভাবে অর্জিত হয়নি। আজকের পরিণতির পেছনে প্রধানত দায়ী গণতন্ত্রহীনতা। গণতন্ত্রহীনতা কীভাবে ধাপে ধাপে আমাদের আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে, তা সুচারুরূপে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির গণমাধ্যমকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অস্তিত্বের প্রতিফলন। এটা নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই। এখন ঘর বা দেশ কীভাবে সাজানো হবে তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তিমূল, আর এ ভিত্তিমূল নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যুক্তিসংগত নয়। এটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলে আমাদের দেশের অস্তিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বাংলাদেশের জনগণ এ ধরনের কোনো চিন্তা বা প্রয়াসকে কখনোই সমর্থন করবে না। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই ইতিহাসে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রথম প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এ ভিত্তিমূলকে ধরেই আমাদের সামনে যেতে হবে। এটাকে বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক করলে বাংলাদেশ বলে কিছু থাকে না। আর বাংলাদেশ না থাকলে আমরাই থাকি না। তাই মুক্তিযুদ্ধ হতে হবে আমাদের সব কর্মোদ্যোগের শুরু।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নুরুল আমিন বেপারী গণমাধ্যমকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধকে সবাই সম্মান করে এবং মুক্তিযুদ্ধকে সবাই স্বীকার করে। ১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করেনি তাদের প্রেক্ষাপট ভিন্ন, তারা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দেয়। তবে ২০২৪-এর গণ অভ্যুত্থানের পরে যে প্রশ্ন উঠেছে সেটা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে ওঠেনি। এটাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ যে স্পিরিটের ওপর ভিত্তি করে হয়েছিল এবং বাংলাদেশটা স্বাধীন হয়েছিল সেগুলো পরে লুণ্ঠিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা একটি গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিলেন, বৈষম্য দূর করতে চেয়েছিলেন, এ ভূখণ্ডের মানুষের সংহতি ও ঐক্য চেয়েছিলেন। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম, শেখ মুজিবের মেয়ে (শেখ হাসিনা) শেষ সময়ে দেশটাকে এমনভাবে শাসন করলেন যেখানে গণতন্ত্র ধুঁকতে ধুঁকতে নিঃশেষ হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, যেটাকে সবাই ফ্যাসিস্ট বলে, সেই একনায়কতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশটাকে চালিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তর্কবিতর্ক চলতে থাকলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আপতদৃষ্টিতে আওয়ামী লীগকে বাদ দিলেও বিএনপি কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক দল। এ দলটি মুক্তিযুদ্ধের স্পিরিটকে ধারণ করে। এরকম বড় একটি দলকে গুরুত্ব না দিয়ে কেউ থাকতে পারবে না। মুক্তিযুদ্ধকে অবজ্ঞা করে বিএনপির বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়াতে গেলে আবার সংঘাত বাঁধবে। আর ’২৪-এ যারা গণ অভ্যুত্থান করেছে তারা মুক্তিযুদ্ধের স্পিরিটকে ধারণ করেই দেশটা গড়তে চাইবে। ফলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক আগামীতে খুব বেশি হবে না।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, আদর্শ ও অভীষ্ট আর জুলাই গণ অভ্যুত্থানের চেতনা ও লক্ষ্য এক সূত্রে গাথা। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রত্যয়ে জাতি, ধর্ম, জেন্ডার ও সংস্কৃতিসহ সব বৈচিত্র্যের বৈষম্যহীন, সমঅধিকার-ভিত্তিক সহাবস্থান নিশ্চিতসহ সুশাসিত, দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের চিরন্তন প্রত্যাশায় একাত্তরে যেমন এ দেশের মানুষ রক্ত দিয়েছে, একইভাবে চব্বিশের যোদ্ধারাও একই প্রেরণায় আত্মত্যাগ করেছে। একাত্তরের বিজয় পরাধীনতার বিরুদ্ধে আর চব্বিশের বিজয় কর্তৃত্ববাদী চোরতন্ত্রের বিরুদ্ধে। উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের আন্দোলন এ দেশের সব মানুষের পরিচয়ও অবস্থাননির্বিশেষে মৌলিক মানবাধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে। এ আন্দোলন চলমান ও চলবে।