প্রতিটি সন্তানের কাছেই তার পিতা-মাতা গর্বের বিষয়। বিশেষ করে যদি সেই পিতা-মাতার দেশের কল্যাণে অবদান থাকে এবং কোটি কোটি মানুষের সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তাঁদের ঘিরে থাকে, তাহলে সেই সন্তানের জীবন হয়ে ওঠে সার্থক। আমি সে রকম এক সৌভাগ্যবান সন্তান। আমার পিতা ছিলেন এ দেশের জননন্দিত রাষ্ট্রপতি।
তাঁকে দিনের বেশির ভাগ সময় রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকতে হতো, সে জন্য আমি ও আমার ছোট ভাই পিতার সান্নিধ্য খুব কমই পেয়েছি।
আমার বাবা যখন শহীদ হন, তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু ঘটনা স্মৃতির ক্যানভাসে জ্বলজ্বল করে।
আমি যখন ক্লাস নাইনে ওঠি, তখন কাকতালীয়ভাবে ক্লাসে নবম স্থান অধিকার করি।
সে বছরই আব্বা-আম্মা নেপাল যাবেন রাষ্ট্রীয় সফরে। এর আগে নেপালের রাজা সপরিবারে বাংলাদেশ সফরে আসেন। এরই পাল্টা সফরে আব্বা-আম্মা নেপাল সফরে যাচ্ছেন। নেপালের রাজার ছেলেকে আমি টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছি।
কারণ আব্বা আমাদের কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতেন না। আব্বা-আম্মার সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। আমার মাথায় চট করে একটা বুদ্ধি এলো। রাজার ছেলে যদি বেড়াতে আসতে পারে, তাহলে আমরা কেন যেতে পারব না। একদিন সন্ধ্যায় আব্বাকে কাছে পেয়ে আম্মুর দিকে তাকিয়ে বেশ জোরালো স্বরে বললাম, রাজার ছেলে যদি রাজার সঙ্গে বেড়াতে আসতে পারে, তাহলে আমরা কেন তোমাদের সঙ্গে যেতে পারব না? সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল করলাম, আব্বা ঝট করে প্রচণ্ড রাগের সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘তোমরা কোনো রাজার ছেলে নও।যাও, পড়তে বসোগে।’ এরপর আর আমার ওখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস হলো না। কারণ এরপর দাঁড়িয়ে থাকলে উত্তম-মধ্যমের ব্যবস্থা হতো। পড়ার টেবিলে গিয়ে বসলাম, কিন্তু দুঃখে আর কষ্টে পড়তে পারলাম না।
রাতে খাবার টেবিলে আম্মা বললেন, ‘বিদেশে তো যেতে পারলে না, দেখি তোমার আব্বুকে বলে দেশের ভেতরে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাব। কি, এবার খুশি তো?’ আম্মুর কাছে বেড়ানোর আশ্বাস পেয়ে আমরা দুই ভাই মহাখুশি।
সম্ভবত ১৯৮১ সালের জানুয়ারির শেষ দিক। স্কুল খুলে গেছে। দুই ভাই স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছি। হঠাৎ আম্মু এসে বললেন, ‘আজ স্কুলে যেতে হবে না। আমরা সবাই বেড়াতে যাব। তাড়াতাড়ি স্যুটকেস গুছিয়ে তৈরি হয়ে নাও।’ আমরা তো অবাক। কিছুক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে নিলাম। দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে উঠলাম দুই ভাই। আব্বা-আম্মাও উঠলেন। বাড়ি থেকে সোজা এয়ারপোর্টে গেলাম। গাড়ি থেকে নেমে হেলিকপ্টারে উঠলাম। হেলিকপ্টার ঢাকা থেকে সোজা মোংলা বন্দরে গিয়ে থামল। আব্বার দিকে তাকিয়ে দেখি মুচকি মুচকি হাসছেন। তারপর কাছে ডেকে বললেন, ‘চলো, জাহাজে উঠি।’ দেখলাম, আমাদের সামনে চারতলা একটি সুন্দর জাহাজ দাঁড়িয়ে। আব্বার সঙ্গে জাহাজে উঠলাম। জাহাজ ছাড়ল। কিছুক্ষণ পর আব্বা আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলো তো পিনো, এই বন্দরটার নাম কী?’ আমি কিছু চিন্তা না করেই জবাব দিলাম, কি জানি। আব্বা বললেন, ‘লম্বা যত আহাম্মক তত।’ আমি বললাম কেন? আব্বা একটা নামফলকের দিকে দেখিয়ে বললেন, ‘ওই দেখো কী নাম।’ তারপর আব্বা জাহাজের মধ্যেই সরকারি লোকজনের সঙ্গে ফাইলপত্র নিয়ে মিটিংয়ে বসলেন। আর আমরা দুই ভাই চারতলায় আম্মুর কাছে গিয়ে বসলাম। সেদিন বিকেলবেলা আমরা সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্টে পৌঁছলাম। জাহাজ থেকেই দেখলাম, হরিণগুলো নদীর ধারে এসে পানি খাচ্ছে। আব্বা এসে কখন যে পেছনে দাঁড়িয়েছেন টেরই পাইনি। আব্বা পেছন থেকে বলে উঠলেন, ‘কে কয়টা হরিণ গুনতে পারবে?’ তাড়াতাড়ি দুই ভাই হরিণ গুনে খুব সম্ভব পাঁচ-ছয়টা পর্যন্ত গুনতে পারলাম। আব্বাও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ-ছয়টাই হরিণ গুনতে পারলেন। তখন তিনি আমাদের বললেন, ‘তোমাদের দৃষ্টিশক্তি তো খুব ভালো।’ এই বলে নিচে নেমে গেলেন। হিরণ পয়েন্টের এক জায়গায় আব্বার মিটিং ছিল। তিনি যাওয়ার পরই আমরা নিচে নেমে নদীর ধারে বেড়াতে গেলাম। সন্ধ্যায় আব্বা ফিরে এলেন। রাতে জাহাজের মধ্যে খাবার টেবিলে আমরা সবাই নানা রকম গল্প করলাম। বেশ রাত করে আমরা ঘুমাতে গেলাম।
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে জাহাজের জানালা দিয়ে দেখি পরিচিত দৃশ্য। তাড়াতাড়ি দুই ভাই মুখ ধুয়ে কাপড় পরে বের হয়ে দেখি, আম্মা আমাদের ডাকতে আসছেন। আমাদের দেখে তিনি বললেন, ‘তাড়াতাড়ি এসো, নাশতা শেষ করো।’ নাশতা শেষ করে দৌড়ে বাইরে এলাম। এসে দেখি, আব্বা বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের দেখে বললেন, ‘বলো তো এই নদীর নাম কী?’ সঙ্গে সঙ্গে আমি বললাম, বুড়িগঙ্গা। আব্বা তখন বললেন, ‘মাথায় তাহলে কিছু আছে, শাব্বাশ।’ জাহাজ এসে ঘাটে ভিড়ল, আমরা গিয়ে গাড়িতে উঠলাম। বাসায় আসার পর আব্বা অফিসে চলে গেলেন। রাতে যখন অফিস থেকে ফিরলেন, তখনো আমরা জেগে। আমাকে ডেকে বললেন, ‘খুশি তো?’ আমি বললাম, হ্যাঁ।
এই ছিলেন আমার আব্বু। তাঁর ছিল সমুদ্রের মতো বিশাল হৃদয়, আকাশের মতো উদার মন। বিশাল সরকারি দায়দায়িত্ব সত্ত্বেও সারা দিনে আমাদের সামান্য হলেও কিন্তু সময় দিতেন। আব্বার অনেক স্মৃতি মনের পর্দায় গেঁথে আছে। আমার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই স্মৃতিগুলোও গভীর থেকে গভীরতর হয়ে মনে গেঁথে যাচ্ছে।
লেখক : ভাইস চেয়ারম্যান, বিএনপি
সূত্র : বই, জিয়া কেন জনপ্রিয়।সম্পাদনা : এ কে এ ফিরোজ নুন। কাকলী প্রকাশনী, ঢাকা