রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়েই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আরও আগ্রাসী ভূমিকায় ভারত। ১৬ ডিসেম্বরকে ভারতের ঐতিহাসিক বিজয় উল্লেখ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মঙ্গলবার সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক পোস্টে একাত্তরে ভারতের ঐতিহাসিক বিজয় নিশ্চিতে আত্মত্যাগ দেওয়া ভারতীয় সেনাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। পোস্টে বাংলাদেশের নাম বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ সরাসরি উল্লেখ না করে ১৬ ডিসেম্বরকে
ভারতের ঐতিহাসিক বিজয় উল্লেখ করে যা জানানোর তা জানিয়ে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। এরই মধ্যে বাংলাদেশকে স্বস্তিতে না রাখার অ্যাজেন্ডায় বিশাল ফান্ডিংসহ আরও নানা বন্দোবস্ত পাকা করে নিয়েছে ভারত। সিদ্ধান্তদৃষ্টেই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতা ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টাকারীসহ বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য করা হয়েছে ভারতকে। সেই সঙ্গে ঘুরছে আরও ভয়ংকর বার্তা। জুলাই যোদ্ধাদের টার্গেট করে কিলিং মিশনের অংশ হিসেবেই হাদিকে হত্যাচেষ্টা। ঘটনাচক্রে সফল হতে পারেনি কিলাররা। তাদের প্রায় সবাইকে দ্রুত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নিতে কাজ করেছে ভারতীয় শক্তি। তারা ছাড়াও আওয়ামী লীগের প্রায় ৫০ হাজার নেতাকর্মীর নিরাপদ আশ্রয় ভারতের বিভিন্ন এলাকায়। তাদের মাধ্যমে ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় পেশাদার সন্ত্রাসীদের জন্য অস্ত্র-গুলি, অর্থ পাঠানো হচ্ছে। তাদের বিশেষ টার্গেটে জুলাই যোদ্ধারা। নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার পরিবেশও তৈরি হচ্ছে ভারতীয় প্রযোজনায়। এ-সংক্রান্ত পর্যাপ্ত তথ্য-সাবুদ পেয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধাদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তা পর্যাপ্ত বা স্বস্তিকর নয় জুলাই যোদ্ধাদের কাছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার এক দিন পরই তেজী সহচর শরীফ ওসমান হাদিকে গুলির মধ্য দিয়ে তারা নিশ্চিত হয়ে গেছে তাদের বাঁচতে দেওয়া হবে না।
দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় আগ্রাসন এবং আওয়ামী লীগের দেশবিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অন্যতম সোচ্চার কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত হাদি। তিনিসহ শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন জুলাই যোদ্ধার ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা হতে পারেÑএমন স্পর্শকাতর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরকারকে আগেই জানানো হয়েছিল। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। টার্গেট কিলিংয়ের ওই তালিকায় হাদি ছাড়াও হাসনাত আবদুল্লাহ, নাহিদ, সারজিস, আসাদুজ্জামান ফুয়াদসহ আরও কয়েক জুলাই সংগঠকের নামের তালিকা তারা জেনেছেন। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি ভাঙার সঙ্গে যাদের নাম জড়িয়েছে, তাদের নামও রয়েছে এই তালিকায়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, হাদির ওপর হামলার আগে তিনি নিজেই জানতেন, তার জীবন বিপন্ন। তিনি পোস্ট দিয়ে জানিয়েছিলেন, তিনি শহীদ হতে প্রস্তুত। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গেও কথা বলেছেন।
ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েম করা শেখ হাসিনার পতন কোনোভাবেই হজম করতে পারছে না ভারত। বিশেষ কয়েক একান্তজনসহ শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে আংশিক কৃতজ্ঞতা শোধ করেছে দেশটি। তাদের মূল টার্গেট পয়েন্টে জুলাই আন্দোলনের ফ্রন্টফিগাররা। তাদের একটাকেও জ্যান্ত না রাখার নির্দেশ ভারত থেকে শেখ হাসিনা নিয়মিতই দিচ্ছেন। তার এ-সংক্রান্ত কিছু অডিও প্রকাশও পেয়েছে। ঢাকা এ ব্যাপারে দিল্লির দৃষ্টি আকর্ষণ করে পাত্তা পায়নি। ঘটনাপ্রবাহে জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যেও সেই যূথবদ্ধতা নেই। অভ্যুত্থানের এক বছরের মাথায় এসে তাদের মধ্যে নানা বিভাজন ও বিভক্তি। জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্ররা নতুন দল করেছে। কিন্তু দলটি নানা ইস্যুতে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে, নেতাদের কারও কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। সরকারও ভালোভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারছে না। সংস্কার ও ফ্যাসিস্টের বিচার নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি বেড়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে তা ক্রমেই চরম রূপ নিচ্ছে।
ক্ষমতার কাছাকাছি একটি মহলও উল্টাপাল্টা করছে। নানা ইস্যু সৃষ্টি করে দেশের ভেতরে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারাও চলছে। এ পরিস্থিতি শেখ হাসিনাসহ বিতাড়িতদের জন্য আশীর্বাদের। ভারতের জন্যও গেম রোল করা সহজ হয়েছে। যথারীতি ভারত এ সুযোগ পুরোটাই লুফে নিয়েছে। তারা আওয়ামী সন্ত্রাসীদের জন্য দেশকে অভয়ারণ্য করে দিয়েছে। সেখান থেকে তারা বাংলাদেশে চালাচ্ছে নানা উসকানি। এটিই তাদের এখনকার একমাত্র সাংগঠনিক কাজ। শেখ হাসিনা নিজেও প্রায়ই ফোনে বিভিন্ন নেতার সঙ্গে কথা বলছেন। দিচ্ছেন দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কড়া নির্দেশনা। ভারতের গণমাধ্যমগুলোতে মাঝেমধ্যে আওয়ামী লীগের পলাতক সন্ত্রাসীদের তৎপরতার খবর প্রচার হচ্ছে। বাংলাদেশ নিয়ে সামনে ভারতের আরও হিংস্র-ভয়ংকর হয়ে ওঠার শঙ্কা ঘুরছে। দেশটির রিমোটে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পক্ষে বয়ান তৈরি করা কালচারাল উইংও উসকানি বাড়িয়ে দিয়েছে। নানা উসকানিতে জনগণকে বিভাজিত ও লক্ষ্যচ্যুত করার অ্যাজেন্ডাও বেশ জোরদার। জুলাই বিপ্লবীদের হত্যাযোগ্য করে তোলার চিকন হাইপও বেশ চমকপ্রদ। জোরদার হচ্ছে ‘আগেই ভালো ছিলাম’, আওয়ামী লীগ ছাড়া ইনক্লুসিভ নির্বাচন হবে না’ ধরনের বয়ানও।