বাংলাদেশে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং সামাজিক শান্তি বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক চাপও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এই প্রতিবেদন সেই প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব, যাতে বোঝা যায় কিভাবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় দিকই দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়—এটি দেশের গণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও জনগণের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কিন্তু প্রতিবার নির্বাচনের আগমুহূর্তে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। নির্বাচনকালীন সময়ে সহিংসতা, কেন্দ্র দখল, ভোটার ভীতি, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব ও রাজনৈতিক সংঘর্ষের আশঙ্কা বারবার নির্বাচনকে বিতর্কিত করে তোলে। ফলে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আসন্ন ফেব্রুয়ারি নির্বাচনকে ঘিরে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতা নিয়ে ইতোমধ্যেই গুরুতর সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই একে অপরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য হুমকি, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উদ্দেশ্য প্রণোদিত অপপ্রচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব অনিয়ম ও উত্তেজনা নিরসনে নির্বাচন কমিশন কিংবা প্রশাসনের কার্যকর কোনো প্রতিকার এখনো দৃশ্যমান নয়।
এর পাশাপাশি মনোনয়ন পত্র দাখিলের প্রাক্কালে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ আরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিভিন্ন জেলায় ডিসি অফিস থেকে প্রার্থীদের বের করে দেওয়া, বৈধ প্রার্থীকে অবৈধ ঘোষণা করা এবং বিতর্কিত বা অবৈধ প্রার্থীকে বৈধতা দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে। এসব ঘটনায় প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং সামগ্রিকভাবে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়ে। উদাহরণস্বরূপ ফেনী সংসদীয় ৩ আসনের আখতারুজ্জামান নমিনেশন জমা দিতে গেলে ডিসির অফিসেই আক্রান্ত শিকার হন। যা তিনি নিজেই সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর মুখপাত্র হাসনাত আব্দুল্লাহ ও আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রকাশ্যে বিএনপির বিরুদ্ধে জোর-জবরদস্তি ও শক্তি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী সভা-সমাবেশে বিএনপির প্রার্থীরা অন্যান্য দলের কর্মী-সমর্থকদের হুমকি দিচ্ছেন এবং ভোটারদের ধানের শীষ ছাড়া অন্য প্রতীকে ভোট না দিতে চাপ সৃষ্টি করছেন। এ ধরনের আচরণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
একই সঙ্গে তিনি জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) বিএনপির পক্ষে কাজ করার অভিযোগও উত্থাপন করেন।
বর্তমানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সমমনা জোট ও জামায়াতসহ ১০ দলীয় জোটের অংশগ্রহণে একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে—এমন প্রত্যাশা জাতির ছিল। মাঠপর্যায়েও একটি সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল। তবে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে, যা নির্বাচনী পরিবেশকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনই আমলা উর্ধ্বতন কর্মকর্তা অতিমাত্রায় দেখতে রাজনৈতিক দলকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বেছে নিয়েছে। অভিযোগ ভারতীয় বিভিন্ন এজেন্ট, বিশেষ করে প্রথমআলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা এবং ভারত সরকার পক্ষ থেকে রাষ্ট্রকে নয় নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন জানিয়েছে। এই ধরনের নানা কর্মকাণ্ড ইতিমধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে উদ্যোগ সৃষ্টি করেছে এবং জাতির মধ্যে আসন্ন নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন করছে।
আজ ৪ জানুয়ারি ২৬ দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের বহুল আলোচিত সাগর-রুনি হত্যার প্রতিবেদন রিপোর্ট আজ আদালতের জমা দেওয়ার কথা হলেও আবারো পিছিয়ে দিয়েছে বলে রিপোর্ট করেছে এই নিয়ে ১২৩ বার তদন্ত প্রতিবেদন পেছানো হলো।
মেজর সিনহা হত্যা মামলা বিচারের রায় ঘোষণার পরও কোন অদৃশ্য শক্তিতে ওসি প্রদীপের ফাঁসির রায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছেনা!
শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের দেশে থেকে বের করে ভারতে পাঠানোর নাটক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিচার নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান ইত্যাদি ঘটনার জন্য সাধারণ মানুষের বিচার ব্যবস্থা ও প্রশাসন প্রতি আস্থা তলানিতে পৌঁছেছে।
দেশের এমন প্রেক্ষাপটে আগামী ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভবিষ্যৎ এবং পরবর্তী দলীয় সরকারের প্রতি আস্থা এবং গ্রহণযোগ্যতা কোন ভিত্তিতে মূল্যায়ন হবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি এবং স্থিতিশীলতার উপর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা বিগত সরকারের মাধ্যমে বিশ্বের আনিত ঋণের দায় বহন করে নতুন সরকারকে ভারত কিংবা বিদেশি শক্তির উপর নির্ভরশীল হওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সাম্প্রত ভেনিজুয়েলার আমেরিকার সাঁড়াশি অভিযান থেকে বোঝাই যাচ্ছে প্রভাবশালী দেশগুলো কিভাবে দুর্বল দেশগুলোর উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে।
অর্থনৈতিক চাপ ও বিনিয়োগ- যেমন তেলের দাম বৃদ্ধি, রপ্তানি-আমদানি ব্যাহত হওয়া বা বৈদেশিক বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে। এটি নির্বাচনী পরিবেশে রাজনৈতিক নেতাদের তর্ক ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নকে প্রভাবিত করতে পারে।
রাজনৈতিক সমর্থন ও চাপ: বিদেশি রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থার সমর্থন বা সমালোচনা স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিতকরণের জন্য আন্তর্জাতিক মনিটরিং বা প্রেসার হতে পারে।
সামরিক ও নিরাপত্তা দিক: সীমান্ত, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক রুটে কোনো আন্তর্জাতিক উত্তাপ নিরাপত্তা উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে।
এর ফলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নজরদারী রাখতে হতে পারে।
সামাজিক মনোভাব ও গণমাধ্যম:
আন্তর্জাতিক উত্তাপ ও খবর দেশের নাগরিকদের মানসিকতা প্রভাবিত করতে পারে।
ভয়, আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলে ভোটারদের আচরণ বা নির্বাচনী শান্তি প্রভাবিত হতে পারে।
বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক উত্তাপ অবশ্যই প্রভাব ফেলবে, তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণ, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা মূল প্রভাব নির্ধারণ করবে। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক চাপ সহনীয় করা সম্ভব,
যদি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হয়।
বাংলাদেশে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য এবং সামাজিক শান্তি বজায় রাখার জন্য জাতির করণীয় কয়েকটি দিক বজায় রাখা দরকার যেমন–
সচেতন ও সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণ: ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার সচেতনভাবে ব্যবহার করা। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজন বাড়ানো প্রচারণা এড়ানো।
আইনের শাসন ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি চাপ নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করে গড়ে তোলা। যেকোনো ধরণের ইভিএম বা ভোটের অনিয়ম, ভোটে প্রভাবিত করার চেষ্টা প্রতিহত করা।
রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ মানতে প্রশাসনিক নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নেওয়া।
সকল রাজনৈতিক দল যেন নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলে সে ব্যাপারটা রাজনৈতিক দলগুলো থেকে নির্বাচন কমিশনকে প্রতিশ্রুতি আনা।
সহিংসতা, হুমকি, এবং উস্কানিমূলক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকে।
সুশৃঙ্খল গণমাধ্যম ও তথ্যের গুরুত্ব: সঠিক তথ্য প্রচার নিশ্চিত করা। তথ্যপ্রযুক্তি ডিপার্টমেন্টকে ভুয়া খবর বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের মাধ্যমে সামাজিক উত্তেজনা সৃষ্টি রোধ করার বাস্তবমুখী প্রদক্ষেপ নেওয়া।
সামাজিক সংহতি ও শান্তি রক্ষা ধর্ম, ভাষা বা রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে ভয় বা হিংসার কারণ বানানো থেকে বিরত থাকা। স্থানীয় কমিউনিটি এবং নাগরিক সমাজ শান্তিপূর্ণ মনোভাব বজায় রাখে।
আধিপত্যবাদ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশকে বাঁচাতে হলে আগামী নির্বাচনে জাতির করণীয় হলো ভোটারদেরকে ভোট কেন্দ্র রক্ষার প্রশিক্ষণ করানো, যেখানে অনিয়ম কিংবা প্রশাসনের জনপ্রিয়তা প্রতিমান হবে সেখানে ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং উর্দ্ধতন কর্মকর্তার কাছে দ্রুত রিপোর্ট পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা।
প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্ব এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ নির্বাচনকে সহিংসতা ও বিতর্কমুক্ত রাখতে। অন্যথায়, জুলাই বিপ্লবের সম্পূর্ণ অর্জন আবারও এক অমাবস্যার কালো অন্ধকারে ডাকা পড়াবে।
মিসবাহ উদ্দিন আহমদ
কলামিস্ট
নিউইয়র্ক