আইন ও সরকারি নীতিমালাকে কার্যত অগ্রাহ্য করে মৎস্য অধিদপ্তর ৪২ কোটি ভেনামি চিংড়ি পোনার ডিম (নপলি- Nauplii) আমদানির অনুমতি দিয়েছে। এমন গুরুতর অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে মৎস্য ও চিংড়ি খাতে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু আইনবহির্ভূতই নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে দেশীয় চিংড়ি হ্যাচারি শিল্প ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়ার শামিল।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় কক্সবাজারে শ্রিম্প হ্যাচারি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (সেব) অফিস কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আমদানির অনুমতি বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে।
সেব-এর সভাপতি এবং কক্সবাজার-৩ সদর আসনের বিএনপি দলীয় মনোনীত এমপি পদপ্রার্থী লুৎফর রহমান কাজল দেশের চিংড়ি শিল্প রক্ষায় অবিলম্বে এমন সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মৎস্য অধিদপ্তর গত ৩ ডিসেম্বর ৩৩.০২.০০০০.১২০.১০.০০১০.২৫.৮৩৭ নম্বর পত্রের মাধ্যমে সাতক্ষীরার দেবহাটার পুরুলিয়া বাজারের ‘তৌফিক এন্টারপ্রাইজ’-এর অনুকূলে ভারত থেকে ৪২ কোটি ভেনামি চিংড়ির নপলি আমদানির অনুমতি দেয়।
পরবর্তীতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ২৩ ডিসেম্বর ওই অনুমতির ভিত্তিতে আমদানির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। অনুমতি অনুযায়ী, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতার ‘বিধা ফিশ ট্রেডার্স’-এর কাছ থেকে এই বিপুল পরিমাণ নপলি আমদানি করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, মৎস্য অধিদপ্তরের এই সিদ্ধান্ত সরাসরি ২০২৩ সালে প্রণীত ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন নীতিমালা এবং ‘মৎস্য সঙ্গনিরোধ বিধিমালা, ২০২৪’-এর চরম লঙ্ঘন। বিদ্যমান বিধিমালায় ভেনামি চিংড়ির ক্ষেত্রে কেবল ব্রুড, পিপিএল ও পিএল আমদানির বিধান থাকলেও নপলি আমদানির কোনো আইনি সুযোগ নেই। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে—কোন আইনের ভিত্তিতে এই অনুমতি দেওয়া হলো?
অপরদিকে, দেশে বর্তমানে ভেনামি চিংড়ির পিএল উৎপাদনের জন্য মৎস্য অধিদপ্তরের অনুমোদিত ৬টি হ্যাচারি কার্যক্রম চালু রয়েছে। এসব হ্যাচারি নিয়মিতভাবে ব্রুড ও পিপিএল আমদানি করে মানসম্মত পিএল উৎপাদন করছে এবং কক্সবাজার, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরীক্ষামূলক ভেনামি চাষে প্রয়োজনীয় পিএল সরবরাহ করে আসছে।
এমন বাস্তবতায় আলাদাভাবে নপলি বা পিএল আমদানির কোনো যৌক্তিকতা নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কক্সবাজারের হ্যাচারি মালিক শাহেদ আলী, মোহাম্মদ আলমগীর, ভুলু চৌধুরী ও সালেহীন মাহিয়ান বিষয়টি নিয়ে বলেন, এ ধরনের অনুমতি অব্যাহত থাকলে দেশের চিংড়ি হ্যাচারি শিল্প কার্যত অচল হয়ে পড়বে। শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারি বেকার হয়ে পড়বেন। এতে একদিকে যেমন দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে আমদানি নির্ভর একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার আশঙ্কাও করছেন তারা।
বিশ্বস্ত সূত্রে আরো জানা গেছে, শুধু ভেনামি নয়—বাগদা ও গলদা চিংড়ির ক্ষেত্রেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নপলি ও পিএল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
এ অবস্থায় খাত সংশ্লিষ্টরা অবিলম্বে ‘তৌফিক এন্টারপ্রাইজ’-এর অনুকূলে দেওয়া ৪২ কোটি ভেনামি চিংড়ির নপলি আমদানির অনুমতি বাতিল, অন্যান্য অনুরূপ অনুমোদন প্রত্যাহার এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সেব-এর সভাপতি এবং বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি লুৎফর রহমান কাজল ও মহাসচিব গিয়াস উদ্দিন।