April 9, 2026, 3:44 am

বেছে বেছে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয় ও এআই অবকাঠামোতে হামলা করেছে ইসরায়েল

Reporter Name
  • Update Time : Wednesday, April 8, 2026
  • 7 Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরানের সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি দেশটির বেসামরিক ও সাংস্কৃতিক অবকাঠামোগুলো বেছে বেছে লক্ষ্যবস্তু করেছে ইসরায়েল। গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষস্থানীয় অন্তত ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অসংখ্য গবেষণাকেন্দ্র ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তেহরানের ‘শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি’তে চালানো সাম্প্রতিক হামলাটি এই ধ্বংসযজ্ঞের এক ভয়াবহ প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইরানের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিত শরিফ বিশ্ববিদ্যালয়ে গত সোমবার চালানো হামলায় একাধিক ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কেন্দ্রে। কর্তৃপক্ষের মতে, এই কেন্দ্রে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ডেটাবেইস এবং দীর্ঘ দুই বছরের গবেষণার ফসল পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট মাসুদ তাজরিয়ি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘শত্রুরা ইরানের মেধা ও অগ্রগতিকে ভয় পায়। আমাদের এআই প্রযুক্তি অর্জনের পথ রুদ্ধ করতেই এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে।’

শুধু শরিফ বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের উচ্চশিক্ষা খাতের ওপর পদ্ধতিগত আক্রমণ চালানো হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে—

পাস্তুর ইনস্টিটিউট: শতবর্ষ প্রাচীন এই চিকিৎসা গবেষণাকেন্দ্রেও বিমান হামলা চালানো হয়েছে।

শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়: এখানকার একটি ফটোনিক্স ল্যাবরেটরি ধ্বংস করা হয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়: এই প্রতিষ্ঠানের একটি স্যাটেলাইট উন্নয়ন ল্যাবরেটরি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী হোসেন সিমাই সারাফ জানিয়েছেন, এটি কোনো সাধারণ যুদ্ধ নয়, বরং একটি পুরো সভ্যতার মেধা ধ্বংসের চেষ্টা।

শরিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপের সামনে কর্তৃপক্ষ একটি ব্যানার ঝুলিয়ে দিয়েছে যাতে লেখা—‘ট্রাম্পের সাহায্য পৌঁছে গেছে’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার দাবি করে আসছিলেন যে তারা ইরানি জনগণকে “সাহায্য” করতে চান। কিন্তু বেসামরিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেললাইন, সেতু এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বোমা বর্ষণ করে তারা ইরানের ৯ কোটি মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছেন।’

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি—‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা মরে যাবে’—ইরানিদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও একতাবোধ তৈরি করে। ইরানি বেসামরিক অবকাঠামোর সামনে গিয়ে মানববন্ধন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে ক্লাস নেওয়ায় ছাত্রছাত্রীদের প্রাণহানি এড়ানো গেলেও, যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইরানে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। স্টিল ফ্যাক্টরি ও পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টগুলো ধ্বংস হওয়ায় দেশটির অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায়। তেহরানের এক শিক্ষার্থী আল জাজিরাকে বলেন, ‘আপনি যদি একটি দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু আর বিজ্ঞান গবেষণাগারে হামলা চালানোকে জায়েজ মনে করেন, তবে আপনি যেকোনো অপরাধই করতে পারেন। আমাদের ভবিষ্যৎ চুরি করা হচ্ছে।’

বেসামরিক অবকাঠামোতে এই নির্বিচার হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে ঘোষণা করে। যদিও তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানসহ ১৫ জন শীর্ষ শিক্ষাবিদ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ হিসেবে বিবেচনা করে হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু ক্রমাগত ধ্বংসযজ্ঞের মুখে তাঁরাও পাল্টা প্রতিশোধের দাবি তোলেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দম্ভ করে বলেছেন, ওয়াশিংটন আজ যুদ্ধ বন্ধ করলেও ইরানের পুনর্গঠনে ২০ বছর সময় লাগবে। আর যদি যুদ্ধ চলতে থাকে, তবে ইরানকে আগের অবস্থায় ফিরতে ১০০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বেসামরিক স্থাপনায় এই হামলাকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে গণ্য করছে।

ইরানজুড়ে এখন কেবলই ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপের গন্ধ। ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার অপেক্ষায় থাকা সাধারণ ইরানিরা এখন কেবল বেঁচে থাকার এবং তাদের লুণ্ঠিত ভবিষ্যৎ ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © ajkerdorpon.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com