ককরোচ জনতা পার্টি-সিজেপি ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে গত ৭ জুন। আর শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সে আন্দোলন শেষ হয়েছে ২৫ জুলাই, ৪৯ দিন পর। তরুণ প্রজন্মের আবেগ আর তাদের দাবির ন্যায্যতা বুঝে শিক্ষামন্ত্রী যদি ৭ বা ৮ জুনই পদত্যাগ করতেন, তাহলে হয়ত জল এতদূর গড়াতোই না।
আন্দোলনের মুখে বা ঘটনার দায় কাঁধে নিয়ে পদত্যাগের ঘটনা কিন্তু ভারতে নতুন নয়। ভারতের ইতিহাসে রাজনৈতিক জবাবদিহির সবচেয়ে বড় উদাহরণ লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, তাও দেশ স্বাধীনের মাত্র ৯ বছরের মাথায়। ১৯৫৬ সালে তামিলনাড়ুর আরিয়ালুরে একটি ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় ১৫০ জনেরও বেশি মানুষ মারা যায়।
রেল দুর্ঘটনার জন্য যেমন রেলমন্ত্রী দায়ী নন, বিমান দুর্ঘটনার জন্য যেমন বিমানমন্ত্রীর দায়ী নন; তেমনি প্রশ্ন ফাঁসের দায়ও পুরোপুরি শিক্ষামন্ত্রীর নয়। তবু নৈতিক দায় নিতে হয় দায়িত্বশীলদের। আদালতে যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও পদত্যাগ করতে হয় এম জে আকবরের মত বাঘা সাংবাদিককেও।
প্রশ্নপত্র ফাঁস একটি গুরুতর অপরাধ। প্রশ্নপত্র ফাঁস অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন তছনছ করে দিতে পারে। ৩ মে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার খবর পেয়ে সাথে সাথে সরকার সে পরীক্ষা বাতিল করেছে। শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে যাতে একটি বছর হারিয়ে না যায়, সে জন্য ভারত সরকার দ্রুততম সময়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তায় আবার পরীক্ষা নিয়েছে। পরীক্ষা বাতিল করে নতুন পরীক্ষা নেওয়া ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের আর কিছু করার ছিল না। কিন্তু প্রথমবার যাদের পরীক্ষা ভালো হয়েছে দ্বিতীয়বার তাদের পরীক্ষা ভালো নাও হতে পারে। অর্থনৈতিক সংকটে অনেকে হয়ত দ্বিতীয় পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। তরুণ বয়সে এত বড় চাপ সামলানোর মত মানসিক শক্তির সবার থাকে না। ৩ মের নিট পরীক্ষা বাতিলের পর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অন্তত ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তাহলে কি ফাঁস হওয়ার প্রশ্নের পরীক্ষাই বহাল রাখা উচিত ছিল। ন্যায্যতা তো সেটারও অনুমোদন দেবে না। দায়িত্বশীলতা আসলে এক ধরনের শাখের করাত।
৩ মে’র নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস- ভারতে এ ধরনের ঘটনা প্রথমও নয়, সম্ভবত শেষও নয়। এমনকি ৩ মের পরও, এত আন্দোলনের মাঝেও প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। পুলিশ অনেককে আটক করেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস ভারতে নতুন কোনো প্রবণতা নয়। বিভিন্ন রাজ্যে ভর্তি বা চাকরির পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা আকছার শোনা যায়। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন প্রহ্লাদ যোশী। এখন ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিদায়ে কি কাল থেকে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ হয়ে যাবে? সম্ভবত না। কী করতে হবে, সেটা সহজ কথায় বলে দিয়েছেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শরিক হয়ে টানা ২৬ দিন অনশন করা শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুক। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর আন্দোলনকারী ও দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে সোনম বলেছেন, ‘শুধু পদত্যাগে জাতি গঠন সম্ভব নয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে। ভবিষ্যতে এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে হবে।’ শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে সোনম বলেছেন, ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো অন্যায় না হয়, সে ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’ আসলেই এক শিক্ষামন্ত্রীর বিদায়ে সমস্যার বিদায় হবে না। প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করতে সরকারকে প্রতিশ্রুত কঠোর আইন করতে হবে, তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রীর পদতাগে অবশ্যই ৭০ দিন বয়সী সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি-সিজেপি তথা প্রতিবাদী তারুণ্যের জয় হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে গণতন্ত্রেরই। প্রতিবাদ-প্রতিরোধে যে ন্যাযতা ও জবাবদিহিতার সমাজ গঠনের স্বপ্ন তা আরেকধাপ এগিয়েছে। সোনম ওয়াংচুক বলেছেন, ‘আমি সরকার ও শিক্ষামন্ত্রীর পদক্ষেপকে স্বাগত ও সম্মান জানাই। দেশবাসীকে অভিনন্দন জানাই। আজ আমরা এখানে গণতন্ত্রেরই জয় দেখলাম।