২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন এবং ১৩ নভেম্বর বৃহস্পবিার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ডাকে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। আরো অবনতির আশঙ্কায় সারা দেশে অঘোষিত রেড অ্যালার্ট জারি করেছে প্রশাসন।
‘আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই’- পুলিশ বিভাগ থেকে আশ্বস্ত করার পরও জনমনে আতঙ্ক দূর হচ্ছে না। স্বস্তিতে নেই কেউই। এসব খবরে দেশে থাকা পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন প্রবাসীরা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতিতে প্রবাসীরা স্বজনদের সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দিচ্ছেন। এমনকী ১৩ নভেম্বর শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থল খোলা থাকলেও স্বজনদের না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
এখানে উল্লেখ্য, ১৩ নভেম্বরের কর্মসূচি ঘোষণার পর রাজধানী ঢাকায় একাধিক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। একাধিক বাসে আগুন ও বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণের পর জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দিনভর টিভিতে এসব খবর দেখে প্রবাসীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। অনেকেই তাৎক্ষণিক দেশে ফোন করে স্বজনদের খবর নিয়েছেন।
প্রবাসী শফিকুল ইসলামের পরিবার থাকেন দেশে। নিউইয়র্কে তিনি একাই থাকেন। এ প্রতিবেদককে তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘দেশে যে কী শুরু হলো? ৫৩ বছরেও দেশটায় শান্তি এলো না।’ তিনি আরো বলেন- খুব চিন্তায় আছি দেশে থাকা পরিবার নিয়ে। তার দুই ছেলে কলেজপড়ুয়া। কলেজে যাওয়ার পথে রাস্তায় বিশৃঙ্খলা দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। বাসায় এসে বলছে- আপাতত তারা আর কলেজে যাবে না। তিনিও না করে দিয়েছেন পরিস্থিতি ভালো না হওয়া পর্যন্ত বাসায় থাকতে। বাইরে না যাওয়ারও কথা বলেছেন তিনি।
শফিকুল ইসলামের মত অনেকেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির খবর রাখছেন নিয়মিত। পরিবারের সঙ্গে কথা বলে সবাইকে সতর্ক হতে বলেছেন।
প্রবাসী মাঈনুল ইসলাম বলেন, তার ছেলে ক্লাস সেভেনে পড়ে। স্কুল থেকে বলা হয়েছে ‘১৩ নভেম্বর স্কুল খোলা। কিন্তু স্কুলে এসো না।’ ১৩ নভেম্বর কী ঘটবে তা বলা মুশকিল, এ কারণে ছেলেকে তিনিও স্কুলে যেতে না করেছেন।
প্রবাসী আব্দুল আহাদ রনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ভেবেছিলাম, দেশটায় শান্তি ফিরে আসবে। কিন্তু হলো উল্টো। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নেই। আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। তিনি বলেন, পুলিশ বিভাগ দাবি করছে- ঢাকায় বর্তমানে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু দেশে চলমান পরিস্থিতিতে স্বস্তি পাচ্ছি না।
উল্লেখ্য, ঢাকার পুলিশ কমিশনার সাজ্জাত আলী বলেছেন, ‘ঢাকাবাসীর আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। ১৩ নভেম্বর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব গুজব ছড়ানো হচ্ছে, তা ভিত্তিহীন। ১১ নভেম্বর মঙ্গলবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
১৩ নভেম্বর রাজনীতিক নিষিদ্ধ দলের সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কা প্রসঙ্গে কমিশনার বলেন, ‘একটি-দুটি মোটরসাইকেল থেকে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে, তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এ সব ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের কাজ চলছে। ঢাকাবাসী আমাদের সঙ্গে আছে, তাই কোনো অঘটন ঘটলে তা মোকাবিলার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে।’
এদিকে, রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কায় বাংলাদেশে অবস্থানরত চীনা নাগরিকদের জন্য চরম সতর্কবার্তা জারি করেছে ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাস। দূতাবাসের কনস্যুলার বিভাগ থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানানো হয়, ‘সম্প্রতি বাংলাদেশে একাধিক স্থানে হাতে তৈরি বোমার বিস্ফোরণ ঘটেছে।’
এতে আরও বলা হয়, চলতি সপ্তাহেই জামায়াতে ইসলামী ও এর সহযোগী দলগুলো, এবং অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও অন্যান্যের পক্ষ থেকে বড় আকারের বিক্ষোভ ও সমাবেশ আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই অস্থিরতা সামনে রেখে চীনা দূতাবাস তাদের নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে: ‘বাংলাদেশে অবস্থানরত সকল চীনা নাগরিকদের প্রতি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যেন তাঁরা অত্যন্ত সতর্ক থাকেন, ভ্রমণের সময় সাবধানতা অবলম্বন করেন, এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিক্ষোভ, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান, বা ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল স্থানগুলোর আশেপাশে যাওয়া এড়িয়ে চলেন।’
ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করছে। গত এপ্রিলে তারা যে সতর্কতা জারি করেছে তা এখনো বহাল রেখেছে। বরং তা সংশোধন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিক অশান্তি, অপরাধ এবং সন্ত্রাসবাদের কারণে এই মুহূর্তে তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তারা আরো বলছে- কিছু এলাকায় ঝুঁকি আরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের নিষিদ্ধ এলাকার তালিকায় রয়েছে- খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, অপহরণ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এসব এলাকা নিষিদ্ধ তালিকায় রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে- ২০২৪ সালের গ্রীষ্মকাল থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠনের পর নাগরিক অশান্তি ও সহিংস সংঘর্ষ অনেকটাই কমেছে। তবে মাঝে মাঝে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে, যা হঠাৎ করে সহিংস রূপ নিতে পারে। পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে- যে কোনো ধরনের জনসমাবেশ, এমনকী শান্তিপূর্ণ সমাবেশ থেকেও দূরে থাকতে, কারণ সেগুলো সতর্কতা ছাড়াই সহিংস হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশে সন্ত্রাসী সহিংসতার ঝুঁকি রয়েছে, যার মধ্যে সন্ত্রাসী হামলা এবং অন্যান্য কার্যকলাপ অন্তর্ভুক্ত। এই ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশে কর্মরত যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্মীদের কূটনৈতিক এলাকার বাইরে ঢাকা শহরের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই ঝুঁকির কারণে, ঢাকা শহরের বাইরে ভ্রমণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্মীদের বিশেষ অনুমোদন নিতে হয়।
এদিকে, সম্ভাব্য হামলার গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ১০ নভেম্বর সোমবার মধ্যরাত থেকে বারিধারা কূটনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের আশেপাশে পুলিশ বিশেষ ইউনিট সোয়াট এবং গোয়েন্দা দলের সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।