‘হাসিনা-কাদেরের ফাঁসি দাবি’। এই প্রতিবেদক বাংলাদেশ সফরে থেকে প্রতিবেদনটি করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ফাঁসি বিষয়ে মিডিয়ায় প্রথম রিপোর্ট এটি। ১৫ মাসের মাথায় ফাঁসির রায় আলোড়ন তুললো বিশ্বে।
অবশেষে গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড পেলেন শেখ হাসিনা। গত ১৭ নভেম্বর ‘আইসিটি’ কোর্ট ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে। হাসিনার রানিংমেট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালও মৃত্যুদণ্ড পেলেন। তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী মামুনের পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। রাজসাক্ষী হওয়ায় এমন সীমিত সাজা। জুলাই আন্দোলনের পক্ষশক্তি রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। জাতিসংঘের পরিসংখ্যানে ছাত্র-গণ-অভ্যুথানে নিহত ১৪০০। ১৫ সহস্রাধিক আহত, পঙ্গু ও চক্ষু হারানো। স্বল্প সময়েই রায় প্রদানের সক্ষমতায় আইসিটি প্রশংসিত হচ্ছে।
অন্যদিকে বিচারপ্রথা যথাযথ হয়নি বলে অভিযোগও উঠেছে।
শেখ হাসিনা এখন ভারতের ‘দায় না সম্পদ?’
নতুন অঙ্কে বাংলাদেশ-ভারত নিরাপত্তা উপদেষ্টাদ্বয়
দীর্ঘমেয়াদী নারী-প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুদন্ডে সারাবিশ্ব হতবাক। আশ্রয়দাতা দেশ ভারতও বিপাকে পড়লো বলে প্রচারণা। বাংলাদেশ-ভারত আসামী প্রত্যার্পণ চুক্তি থাকায় বিতর্ক বাড়ছে। ফাঁসির আসামীদের ফেরৎ প্রদানে পুনঃ চিঠি দিচ্ছে বাংলাদেশ। ভারতের অভ্যন্তর থেকেও দাবি উঠছে ফেরৎ দিতে। প্রশ্ন উঠেছে শেখ হাসিনা ভারতের ‘দায় না সম্পদ?
ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ। ৫ আগস্ট ২০২৪ দিল্লি পলাতকা প্রধানমন্ত্রীকে তিনি স্বাগত জানান। সহোদরা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সম্মানজনক আশ্রয় পান। উভয়ের নিকটজন সামরিক উপদেষ্টা জে. তারেক সিদ্দিকীও ছিলেন। ‘কৌশলবিদ’ অজিত দোভাল পরবর্তীতে কূটনৈতিক ভূমিকা রাখেন। থাইল্যান্ড সফরে থাকা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীকে ‘ইউটার্ন’ করান। বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকার-প্রধান ড. ইউনূসকে যৌথবৈঠকে বসান। বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান ছিলেন যোগসূত্রে। দুই নিরাপত্তা উপদেষ্টাই আবার দিল্লি-বৈঠকে মুখোমুখি। শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণ বিষয়ে রচিত হচ্ছে নতুন অঙ্ক।
ইউনূসকে হটিয়ে প্রেসিডেন্টকে পটিয়ে সাধারণ ক্ষমার চেষ্টা।
‘ইন্দো-মার্কিন চ্যানেলে’ শেখ হাসিনার নতুন অভিযাত্রা
মৃত্যুদণ্ডাদেশকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন শেখ হাসিনা। প্রথমেই বলেছেন ‘আই ডোন্ট কেয়ার’। ভারতীয় বাঙালিদের বিশাল অংশ তেমনটিই বলেছেন। আওয়ামী লীগের পলাতক মন্ত্রী-নেতারা তাদের দ্বারা প্রভাবিত। কলকাতা-দিল্লির গবেষণা সেল বিশেষ অংক কষছে। তারা বিশ্ব মিডিয়ায় অসংখ্য সাক্ষাৎকার ছেপেছেন। আত্মপক্ষীয় সমর্থন সূচক বক্তব্য রেখেছেন শেখ হাসিনা। জুলাই আন্দোলন ও সরকারের পতন বিষয়ে কথা বলেছেন। নেপথ্যে আমেরিকার হাত ছিল না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। মেটিকুলাস ডিজাইন, ডিপ-স্টেট বা সেন্টমার্টিন হস্তান্তর প্রসঙ্গ নেই। বলেছেন গণহত্যায় আমি নির্দেশনা দেইনি। বরং প্রশাসনিকভাবে বিভিন্ন স্তর নিরাপত্তার স্বার্থরক্ষা করেছে।
বিশেষ সূত্র মতে, ‘ইন্দো-মার্কিন’ চ্যানেল পেয়েছেন নেত্রী হাসিনা। সেই পথরেখায় বিশ্বস্ততা অর্জনের চেষ্টা চালাচ্ছেন। সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ফাঁসির ফাঁদ থেকে মুক্ত হওয়া। সেক্ষেত্রে অন্যতম ভরসা রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন চুপ্পু। রাষ্ট্রপতি পদাধিকারবলে যে কোনো আসামিকে ক্ষমা করতে পারেন।
উল্লেখ্য, পূর্ব প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ ‘সাধারণ ক্ষমা’ দিতেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেককেই ‘ক্ষমা’ পাইয়ে দিয়েছেন। ‘মার্সি’ পিটিশনে’র মাধ্যমে এমন সুযোগ নিতে হয়। নিজের পছন্দের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট তা করবেন বলে প্রত্যাশা। তবে শেখ হাসিনাকে প্রেসিডেন্ট চুপ্পু তেমন প্রতিশ্রুতি দেননি।
২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি চলমান। আওয়ামী শিবিরে প্রচারণা- প্রেসিডেন্ট পদে ঘাটবে রদবদল। বিএনপি এবং জামায়াত নির্বাচনে জয় পেতে মরিয়া। উভয় দলই ভাবি রাষ্ট্রপতি পদে ড. ইউনূসকে চায়। তেমনটি হলে শেখ হাসিনা সাধারণ ক্ষমা পাবেন না। প্রফেসর ইউনূসের বুকে বসিয়ে দিয়েছেন স্থায়ী ক্ষত। সঙ্গত কারণে ড. ইউনূসকে ক্ষমতাহীন করতে মরিয়া আওয়ামী লীগ। সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে ‘স্টেপডাউন ইউনূস’’ আন্দোলন।
বিচার প্রহসন বনাম বাংলাদেশ
পক্ষের যুক্তি-জবাব
হাসিনার মৃত্যুদণ্ডকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলমান। ঢাকায় ১০০১ জন শিক্ষক বিবৃতি দিয়েছেন। ১০২ জন সাংবাদিক নিন্দা জানিয়েছেন। বিবৃতিতে সংযোজিত নামগুলোকে হাসিনাপন্থী বলেছেন প্রতিপক্ষ। যদিও বিবৃতিদাতাদের অধিকাংশই এখন ভূতলবাসী।
শেখ হাসিনার ‘জনসংযোগ বিভাগ অত্যন্ত তাৎপর। জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইট ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’- একই সুর ধরেছে। বলেছে, জুলাই হত্যাকান্ডে ১৪০০ নিহত। অসংখ্য আহত, পঙ্গু, তাই সুবিচার প্রয়োজন। কিন্তু আইসিটি’র বিচারটি বিশ্বমানের হয়নি। আসামিপক্ষ জেরা করার বা কৌশলী নিয়োগের সুযোগ পাননি। ‘অ্যামনেস্টি’ বলেছে উত্থাপিত অপরাধগুলো ‘ক্রস একজামিন’ করা হয়নি।
আওয়ামী লীগ বলেছে, হেগ-এর আন্তর্জাতিক আদালতে কেন নয়। আমরা তো সেখানে বিচার বসানোর আহ্বান জানিয়েছিলাম। বাংলাদেশের ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টে’ বিচারের নামে প্রহসন হয়েছে।
বাংলাদেশ-পক্ষ অবশ্য বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। তাদের মতে, ‘আইসিটি’ কোর্ট প্রতিষ্ঠা পায় হাসিনা শাসনামলে। এর মাধ্যমে ৭/৮ জন শীর্ষ রাজনীতিককে ফাঁসি দেওয়া হয়। তখন ‘আইসিটি’ বৈধ হলে এখন হবে না কেন? সেই একই কোর্টকে এখন তাই ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ বলা অযৌক্তিক।
আসামিদের জেরা প্রসঙ্গে বলা হয়- শীর্ষরা পলাতক। ভারতকে চিঠি দিয়ে আসামিদের পাঠাতে বলা হয়েছে। রেড এলার্ট জারি করেও আসামিদের আনানো যায়নি। অর্থাৎ আদালতের মুখোমুখি ওনারা হননি। ফলে জেরা করা না করার অজুহাত খাটে না।
বাংলাদেশ পক্ষ বলছে একজন শীর্ষ আসামী রাজস্বাক্ষী। যিনি নির্দেশিত হয়ে হত্যাকাণ্ড পরিচালনায় ছিলেন। তার জবানবন্দি বিচারের আন্তর্জাতিক মান ছাড়িয়ে গিয়েছে। এছাড়া ‘আইসিটি’ কোর্টে একটি একক মামলাই চলছে। অপরাপর আদালতের মত এখানে মামলাজট নেই। ফলে গণহত্যা মামলার রায় দ্রুততম সময়েই সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অন্য মামলাসমূহ দ্রুতই আলোর মুখ দেখবে।
হাসিনার ফাঁসি না হলে তরুণ প্রজন্মের নতুন জিংঘাসা
◾ পরিবারের সবাইকে হত্যায় শোকার্তদের কিলিংমিশন’
১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষিত হয়েছে। এক মাসের মধ্যে নিজে হাজির থেকে আপিল করতে হয়। না করলে রায়টি চূড়ান্ত বলে গৃহীত হয়। আগামী ১৬ ডিসেম্বর শেখ হাসিনার হাজিরার শেষ দিন। কিন্তু তার ভারত থেকে ফেরার সম্ভাবনা নেই। ‘আই অ্যাম ড্যাম কেয়ার’ বলে রায়কে অস্বীকার করেছেন।
পলাতকা শেখ হাসিনার আচরণে ছাত্রশক্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুব্ধ। তাদের প্রথম অভিযোগ ১৪০০ শিক্ষার্থী নিহত। ১৫ হাজার আহত, পঙ্গু, চিরতরে অন্ধ। এই বিশাল হত্যাযজ্ঞ বিষয়ে আওয়ামী লীগের মমত্ববোধ নেই। দলনেত্রী শেখ হাসিনা কখনো ক্ষমা চাননি। ‘স্বজন হারানো’ গান গেয়েছেন, কিন্তু এক্ষেত্রে চুপ। বেদনা বোঝানোর জন্য তাকে শিক্ষা দিতে হবে। তার সন্তান নাতি-নাতনিকে ‘জয়বাংলা’ করতে হবে। নিজ পরিবারের কোল খালি হলে ‘জুলাই শহীদদের’ আত্মাহুতিকে বুঝবেন।
উল্লেখ্য, ১৭ নভেম্বর ২৫ ছিল সারা দেশ উত্তাল। বন্ধু-স্বজন হারানো তরুণ প্রজন্ম ছিল অগ্নিগর্ভ। তারা ধানমন্ডি ৩২-এর বাড়ির অবশিষ্টাংশ ভাঙতে চায়। ধূলোয় মিটিয়ে দিতে চায় বঙ্গবন্ধু পরিবারের সর্বস্ব। তাদের চোখে মুখে লক্ষ্য করা যায় রক্তের জিঘাংসা। চোখের সামনে সতীর্থদের আত্মাহুতি দেখেছে। বুলেটবিদ্ধ দেহ, রক্তাক্ত ক্রন্দন, পুলিশ পোড়ানো দেহভস্ম। জীবিত অনেকেই এখনও ট্রমার ভেতর। প্রায় তিন হাজার পঙ্গু জুলাইযোদ্ধা এসেছিল। কেউ বিচার দেখতে, কেউ ৩২ নম্বর ভাঙতে। প্রতিহিংসার অগ্নিদহনে প্রত্যেকে প্রজ্বলিত।
তারা ‘আইসিটি কোর্ট’, ইউনূস সরকার বোঝে না। প্রথম শর্ত, হাসিনা গং-এর প্রামাণ্য ফাঁসি। তাদের স্পষ্ট কথা- কোথায় পালাবে অপরাধীরা। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক, রক্ত দিতে হবে। প্রয়োজনে ‘কিলিং মিশন’ গড়তে বদ্ধপরিকর।
তারিখ নেই নির্বাচনের ও
তারেকে’র প্রত্যাবর্তনের
২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত ঘোষিত হয়নি নির্দিষ্ট তারিখ। অন্যদিকে বিএনপির কর্ণধার তারেক রহমানও রহস্য ছড়াচ্ছেন। ২০ নভেম্বর তার প্রিয় জন্মতিথি। কবে বৃটেন থেকে দেশে ফিরবেন জানাননি। সূত্রমতে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও নির্বাচন একসূত্রে গাঁথা। তা হলো- শেখ হাসিনার রায় পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনা। জুলাই আন্দোলনের ছাত্রশক্তির আদলে কর্মসূচি দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। লকডাউন, শাটডাউন, ব্লকেড, ঢাকা মার্চ ইত্যাদি। নিরাপত্তাজনিত কারণে জনসমাজে চলাচল কিছুটা কম। তবে পরিস্থিতি অনুকূল হলে নির্বাচনে সগৌরবে ফিরে আসবে। রাজনীতিক তারেক রহমানও ঘটাবেন রাজকীয় প্রত্যাবর্তন।














