বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) মার্কেটের সাধারণ দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আওয়ামী সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত মাহাবুবুল হক ও তার সহযোগীরা মার্কেটে দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, ভয়-ভীতি ও নির্যাতন চালিয়ে আসছে। ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, তিনি অতীতে ফ্যাসিস্ট আমলের ‘ফ্যাসিবাদের সহযোগী’ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। ফলে দলীয় প্রভাব ও শক্তির জোরে তিনি দীর্ঘদিন একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছেন, যা বাজারের সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি সৃষ্টি করেছে।
শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর পলাশী মোড় বাজার গেটের সামনে মানববন্ধন করে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। মানববন্ধনে শতাধিক দোকান মালিক উপস্থিত ছিলেন। তারা দীর্ঘদিনের ভয়, অন্যায়ের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং অসহায় অবস্থার কথা তুলে ধরেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, বুয়েট মার্কেট পরিচালনা কমিটির নিয়ম অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও ২০১৭ সালের নির্বাচনে মাহাবুবুল হক জোরপূর্বক দখল গ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস.এম. হল ও জহুরুল হক হলের কিছু সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী এবং লালবাগ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান জামালের সহায়তায় তার প্যানেলকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণা করেন।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নজরুল ইসলাম চাউলকে নির্বাচনের আগের রাতে অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস.এম. হলের কুখ্যাত ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী ‘মঞ্জু’কে সভাপতি এবং নিজেকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করেন মাহাবুবুল হক।
নির্বাচনের পর বাজারে শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন ও দখলদারিত্ব। চাঁদাবাজি, দোকান দখল, জোরপূর্বক ক্রয়-বিক্রয়, ভয়-ভীতি—এসব ছিল নিয়মিত ঘটনা। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, মাহাবুবুল হক তার চাচার পরিচয়—যিনি একসময় যুদ্ধাপরাধ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন—ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করতেন এবং প্রশাসনিক প্রভাব দেখাতেন।
মানববন্ধনে ব্যবসায়ীরা জানান, একসময় তিনি চাচার দোকানে সাধারণ কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু চাঁদাবাজি, অবৈধ প্রভাব এবং নানা অপকর্মের মাধ্যমে গত কয়েক বছরে ১০–১২ কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন। এছাড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কনভেনশন সেন্টার, ইকোপার্ক ও ফাস্টফুড ব্যবসাও পরিচালনা করছেন বলে দাবি করা হয়।
বর্তমানে মাহাবুবুল হক ও তার পরিবারের নামে মার্কেটে চারটি দোকান রয়েছে—৬৪ নম্বর তরকারির দোকান, ১৩৯ নম্বর ফলের দোকান, ১৫০ নম্বর কনফেকশনারি (ভাইয়ের নামে) এবং ১৫১ নম্বর চকলেটের দোকান (স্ত্রীর নামে)। এসব দোকানের বাজারমূল্য দুই কোটি টাকারও বেশি। ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, এসব দোকান প্রতারণা, জোরজবরদস্তি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে দখল করা হয়েছে।
মানববন্ধনে আরও অভিযোগ করা হয়, ২০২১ সালে অন্তত ৩১ জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে হুমকি-ধমকি ও সন্ত্রাসী তৎপরতার মাধ্যমে ৪১ লাখ টাকার বেশি হাতিয়ে নেয় মাহাবুবুল হক। বিষয়টি বুয়েট প্রশাসনের কাছে বহুবার লিখিতভাবে জানানো হলেও দলীয় প্রভাবের কারণে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মানববন্ধনে ব্যবসায়ীরা এসব অভিযোগপত্রের কপি গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে তুলে ধরেন।
ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকার পর সম্প্রতি মাহাবুবুল হক আবার বাজারে এসে ত্রাস সৃষ্টি শুরু করেছেন এবং আসন্ন বুয়েট মার্কেট পরিচালনা কমিটির নির্বাচনে নিজেকে প্রার্থী ঘোষণা করে প্রচারণায় নেমেছেন। ব্যবসায়ীরা প্রশ্ন তুলেছেন—‘যে ব্যক্তি সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব করে বাজারকে জিম্মি করে রেখেছিল, সে কীভাবে আবার নির্বাচনে অংশ নেবে? জিতলে কি আবার সন্ত্রাসী রাজত্ব কায়েম করবে?’
ব্যবসায়ীরা প্রশাসনের প্রতি দাবি জানিয়েছেন, মাহাবুবুল হকের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে, তাকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না এবং বুয়েট মার্কেট পরিচালনা কমিটির নির্বাচনে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভোট প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
তারা বলেন, ‘আমরা আর নির্যাতন সহ্য করতে পারছি না। প্রশাসন এখনই ব্যবস্থা না নিলে আমরা আবারও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ব।’
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বুয়েট মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য সচিব কামরুজ্জামান আপন, সদস্য কাউছার শিকদার, যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর রশিদ, সদস্য আবদুল খালেক (কনফেকশনারি), যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইব্রাহিম (বিকাশ, কম্পিউটার), সদস্য মো. আব্দুল খালেক, সদস্য মো. তপন, সদস্য মো. মিরাজ ও সদস্য শওকত মুর্তজা প্রমুখ।
এই বিষয়ে জানতে ওই মার্কেটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হককে ফোন করা হলে তিনি জানান, এ বিষয়ে যে অভিযোগগুলো করা হয়েছে সবই ভুয়া। তিনি আরও বলেন, যারা মানববন্ধন করেছে, তারা কেউই দোকান মালিক নয়। এরপর তিনি ‘পরে ফোন দেবেন’ বলে কল কেটে দেন। তবে পরে একাধিকবার ফোন করার পরও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।