চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে গলা কাটা অবস্থায় একটি কন্যাশিশু হেঁটে যাচ্ছে—এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। ইরা নামের আট বছরের শিশুটিকে স্থানীয় শ্রমিকরা উদ্ধার করে। শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি। গত মঙ্গলবার ভোরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়।
এ ঘটনায় বাবু শেখ নামের এক প্রতিবেশীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এমন সহিংসতার ঘটনা একটি-দুটি নয়, সারা দেশেই নারী ও কন্যাশিশুর ওপর চলছে। প্রতিনিয়ত এসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে সংবাদমাধ্যমে।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ঈদের কাপড় কিনতে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে গিয়ে ধর্ষণ ও ছিনতাইয়ের শিকার হন চার সন্তানের এক জননী।
গত বুধবার কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ উঠেছে এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২৫৩টি। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ৩৩টি ও ধর্ষণের পর হত্যা পাঁচটি।
এমন পরিস্থিতিতে সারা দেশে আজ ৮ মার্চ রোববার উদযাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস।
দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ব্যাপক বেড়েছে। ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৪৩১টি এবং ২০২৪ সালে এসংক্রান্ত ১৭ হাজার ৫৭১টি মামলা হয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ১১ মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছে প্রায় দুই হাজার ৬৪৯ জন নারী ও কন্যাশিশু। এমন পরিস্থিতিতে সদ্য নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নারী ও কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা।
নতুন সরকারকে এসব অপরাধ কমিয়ে আনতে হবে। বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী প্রচারেও নারীর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। তাই সরকারের ভাবমূর্তি ধরে রাখতে নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যত দিন না নারী নির্যাতনে জড়িত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর হবে, তত দিন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধূরী বলেন, আমাদের দেশে সব সময় নির্বাচন-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে একটি বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তবে এবার নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার চেয়েও সামাজিক বিশৃঙ্খলা বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও কন্যশিশুদের ওপর নির্যাতন লাগামহীন হয়ে উঠছে। এর মধ্যে আমরা বেশ কিছু নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা দেখেছি।
তিনি বলেন, এর কারণগুলো যদি আমরা দেখি, তাহলে প্রথমত মাদকের বিস্তার অন্যতম বড় কারণ। এসব অপরাধে জড়িতদের বেশির ভাগই মাদকাসক্ত। অন্যদিকে স্থানীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবও অন্যতম কারণ। অপরাধীরা ভাবে, তারা হয়তো পার পেয়ে যাবে। তাই নতুন সরকারকে যা করতে হবে, তা হলো সবার আগে সব ধরনের প্রভাবের বাইরে গিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। বিচারহীনতা যদি একবার সমাজে জায়গা করে নেয়, তাহলে অপরাধ আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরো তৎপর হতে হবে।
নারী নির্যাতন রোধে সমাজে নারীর অবস্থানের উন্নয়নের প্রতিও জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হক বলেন, ‘বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে বেশি দিন হয়নি, তাদের সময় দিতে হবে। তারা এরই মধ্যে অনেক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করছে। আশা করি বিচারও করা হবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সংস্কার করতে হবে আমাদের মস্তিষ্কে। আমাদের সমাজে নারীকে ভোগ্যবস্তু হিসেবে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি, তাতে পরিবর্তন আনতে হবে। নারীর নিরাপত্তায় শুধু নারী শিক্ষাই নয়, পুরুষ শিক্ষায়ও জোর দিতে হবে। ছেলেদের স্কুলে শেখাতে হবে যে, নারী কোনো ভোগ্যবস্তু নয়। সরকারের পাশাপাশি আমাদেরও কাজ করতে হবে