ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের আকাশে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের গর্জন এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আকস্মিক হত্যাকাণ্ডে যখন পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থির, তখন দূর মস্কোয় বসে ভিন্ন সমীকরণ কষছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
উপরিভাগে তেহরানের এই বিপর্যয় রাশিয়ার জন্য অস্বস্তিকর মনে হলেও, অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে— পুতিনের দৃষ্টিতে এটি শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়; বরং বহুদিনের ভূ-রাজনৈতিক আশঙ্কার বাস্তব প্রতিফলন।
২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির নৃশংস পতন পুতিনকে যে বার্তা দিয়েছিল, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি যেন তারই পুনরাবৃত্তি। সে সময় ন্যাটোর নেতৃত্বে সামরিক হস্তক্ষেপে গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হন।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভোটাভুটিতে রাশিয়ার বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ। পুতিনের ঘনিষ্ঠ মহলে এই সিদ্ধান্তকে ভুল হিসেবে দেখা হয়, যা পরবর্তীকালে তাকে পুনরায় প্রেসিডেন্ট পদে ফেরার সিদ্ধান্তে প্রভাবিত করেছিল।
২০১১ সালের অক্টোবরে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থিতা ঘোষণার এক মাসের মাথায় গাদ্দাফি বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হন এবং তার মৃত্যুর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিমা বিশ্ব সে সময় ঘটনাটিকে উদযাপন করলেও, লিবিয়ায় স্থিতিশীলতা বা গণতন্ত্র কোনোটিই প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং দেশটি গৃহযুদ্ধ ও বিভক্তির পথে যায়।
পুতিনের কাছে এটি ছিল এক সতর্কবার্তা— পশ্চিমা বিশ্বের নব্য-উদারবাদী ‘গণতন্ত্রায়ন’ প্রচেষ্টা যদি লাগামছাড়া হয়ে ওঠে, তবে তা রাশিয়ার জন্যও হুমকি হতে পারে। একই বছরে মস্কোয় নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে বিক্ষোভ শুরু হলে ক্রেমলিন সেটিকেও ‘রেড ফ্ল্যাগ’ হিসেবে দেখে।
২০১২ সালে শপথ গ্রহণের আগে কয়েক মাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর পুতিন কঠোর হাতে সেই বিক্ষোভ দমন করেন। এই সময়কাল রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়, যার ধারাবাহিকতায় ইউক্রেন সংকটে হস্তক্ষেপের পথ তৈরি হয়।
বর্তমান ইরান সংকট পুতিনের কাছে তার কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলোর যথার্থতা প্রমাণ করছে বলেই মনে করা হচ্ছে। তিনি মনে করেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব ‘উচ্ছৃঙ্খল ও অযৌক্তিক’ আচরণ করছে। ইউক্রেন ফ্রন্টে রাশিয়ার আগ্রাসনকে যারা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে সমালোচনা করেছিলেন, তাদের জন্য ইরানের ঘটনা এক ধরনের পাল্টা উদাহরণ হিসেবে দেখছেন তিনি।
রুশ বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ রাশিয়ার নিরাপত্তা ঝুঁকির ধারণাকেও নতুন করে উসকে দিয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও রাশিয়া একই ধরনের হামলার মুখে পড়তে পারে। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের কঠোর বক্তব্যগুলোকে তারা এই আশঙ্কার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
ইউক্রেনে রাশিয়ার ২০১৪ সালের অভিযান এবং ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার আক্রমণকে ক্রেমলিন ‘প্রতিরোধমূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তাদের যুক্তি, ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় যেমন সামরিক হস্তক্ষেপ হয়েছে এবং বর্তমানে ইরান যে পরিস্থিতির মুখোমুখি, তা এড়াতেই রাশিয়া আগেভাগে ব্যবস্থা নিয়েছে।
২০০৭ সালে ন্যাটো ইউক্রেন ও জর্জিয়াকে সদস্যপদের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর থেকেই দেশ দুটিকে ‘শত্রু ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখেছে মস্কো। ২০০৮ সালে জর্জিয়ার সঙ্গে স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধে সেই ধারণার পরীক্ষা হয়। পরবর্তীতে ইউক্রেনের ‘ময়দান বিপ্লব’ এবং তার পরবর্তী ঘটনাবলি রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরান এক পর্যায়ে রাশিয়ার অপ্রত্যাশিত অংশীদারে পরিণত হয়। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের সময় ইরান গুরুত্বপূর্ণ ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করে। যদিও এটি নিঃস্বার্থ সহায়তা ছিল না; এর বিনিময়ে তেহরান বিপুল অর্থ পেয়েছিল, যা তাদের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে।
যদিও রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক এতটা গভীর নয় যে মস্কো সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রেমলিনের একটি অলিখিত সমঝোতাও রয়েছে। ইসরায়েল ইউক্রেনকে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র দেয়নি এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞায়ও যোগ দেয়নি। ফলে রাশিয়ার ধনী অলিগার্চদের জন্য দেশটি এক ধরনের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।
এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের যে চেষ্টা করছেন, তাতে মস্কো সরাসরি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাতে চায় না। ইউরোপীয় নেতৃত্ব যেন পরিস্থিতিকে জটিল করতে না পারে— সেটিও রাশিয়ার কৌশলের অংশ।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরানকে বড় ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা রাশিয়ার সীমিত। আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ করলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঝুঁকিতে পড়বে। অন্যদিকে, ইরানের পক্ষেও সেই ব্যয় বহন করা কঠিন হতে পারে।
স্বল্পমেয়াদে অবশ্য এই যুদ্ধ রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক সক্ষমতা চাপে পড়তে পারে, যা ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মানে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে চাপ, বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়। ফলে ইউক্রেনকে দেওয়ার জন্য নির্ধারিত অস্ত্র ইসরায়েলে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। এতে আলোচনায় মস্কোর অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঘরোয়া রাজনীতিতেও পুতিন এই পরিস্থিতি থেকে সুবিধা পেতে পারেন। ইরানের বিশৃঙ্খলা সাধারণ রুশ নাগরিকদের মধ্যে ‘অবরুদ্ধ দুর্গে’ বসবাসের মানসিকতা জোরদার করতে পারে। এতে তিনি স্বৈরাচারী শাসক নয়, বরং জাতির ‘রক্ষক’ হিসেবে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে সক্ষম হবেন।