দশকের পর দশক ধরে যৌন অপরাধে অভিযুক্ত মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টেইনকে ঘিরে চলা তদন্ত নতুন মোড় নিয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসে পাস হয় ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ নামে একটি আইন। কংগ্রেসের উভয় কক্ষে অনুমোদনের পর এতে স্বাক্ষর করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই আইনের মাধ্যমে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সংগৃহীত নথি প্রকাশের পথ উন্মুক্ত হয়।
১৯৯৬ সালে শুরু হওয়া তদন্তের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে নতুন আইনের আওতায় এপস্টেইনের অপরাধসংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ নথি প্রকাশ করতে শুরু করে মার্কিন বিচার বিভাগ। প্রকাশিত এসব নথির মধ্যে রয়েছে লিখিত ডকুমেন্ট, ছবি, ভিডিও এবং ই-মেইল বার্তা। এসব নথিতে বিশেষভাবে নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কিত তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে প্রকাশিত প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন নথির মধ্যে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম বারবার উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এছাড়া তালিকায় রয়েছেন ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা বিল গেটস, এলন মাস্ক এবং সাবেক হোয়াইট হাউস কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাইবেলের ইংরেজি অনুবাদে যতবার ‘গড’ বা ‘প্রভু’ শব্দটি এসেছে, এপস্টেইনের প্রকাশিত নথিতে তার চেয়েও বেশি বার ট্রাম্পের নাম উল্লেখ রয়েছে। বাইবেলের বিভিন্ন ইংরেজি অনুবাদে ‘প্রভু’ শব্দটি প্রায় ৩ হাজার ৩০০ থেকে সাড়ে ৪ হাজারবার ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে বিচার বিভাগ প্রকাশিত এপস্টেইন-সংক্রান্ত প্রায় ৫ হাজার ৩০০ নথিতে ট্রাম্পের নাম পাওয়া গেছে।
এছাড়া ট্রাম্প, তার স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প, ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টসহ প্রেসিডেন্টকে ঘিরে ৩৮ হাজারের বেশি শব্দ বা উল্লেখ এসব নথিতে পাওয়া গেছে। তবে মিরর ইউএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকাশিত নথিগুলোতে ট্রাম্প সরাসরি কোনো অপরাধে জড়িত—এমন সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি নতুন প্রকাশিত নথিগুলোর মধ্যে রয়েছে ই-মেইল, সংবাদ প্রতিবেদন এবং অর্থ লেনদেনসংক্রান্ত বিভিন্ন ডকুমেন্ট, যেগুলোর অনেক তথ্য এপস্টেইনের ব্যক্তিগত ই-মেইল আর্কাইভে সংরক্ষিত ছিল।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, এক সময় ট্রাম্প ও এপস্টেইনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, যদিও পরবর্তী সময়ে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অন্তত ২০০০ সাল পর্যন্ত তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় ছিল। তবে ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এফবিআইয়ের নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মাইকেল রেইটার তদন্তকারীদের জানান, ২০০৬ সালে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হওয়ার পর ট্রাম্প তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। রেইটার বলেন, ট্রাম্প তাকে জানিয়েছিলেন যে, এপস্টেইনের অসদাচরণ সম্পর্কে অনেকেই আগে থেকেই অবগত ছিলেন এবং নিউ ইয়র্কে অনেকেই তাকে ঘৃণার চোখে দেখতেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রকাশিত আরেকটি নথিতে একজন নারীর সাক্ষাৎকারের বর্ণনা উঠে এসেছে, যেখানে তিনি দাবি করেছেন—কিশোর বয়সে তাকে যৌন নির্যাতন করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার অভিযোগ অনুযায়ী, জেফরি এপস্টেইন তাকে ট্রাম্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।
এফবিআইয়ের প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে ওই নারী বলেন, যখন তার বয়স ১৩ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে, তখন ট্রাম্প ও এপস্টেইন তাকে যৌন নির্যাতন করেন। তিনি জানান, এপস্টেইন তাকে নিউ ইয়র্ক বা নিউ জার্সিতে নিয়ে গিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। একপর্যায়ে ট্রাম্প তাকে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বাধ্য করার চেষ্টা করলে তিনি প্রতিবাদ করে তাকে কামড় দেন বলেও দাবি করেন। ওই নারী আরো বলেন, ঘটনার পর দীর্ঘদিন তাকে চুপ থাকতে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
২০১৯ সালের অক্টোবরে, ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট মেয়াদকালে নেওয়া তার শেষ সাক্ষাৎকারে তদন্তকারীরা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি ট্রাম্প সম্পর্কে আরো তথ্য দিতে চান কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি আর তথ্য দিয়ে কী করব, যখন এগুলোর কোনো মূল্যই নেই’।
ট্রাম্প এপস্টেইন-সংক্রান্ত সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এর আগে মার্কিন বিচার বিভাগও জানিয়েছিল, প্রকাশিত কিছু নথিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ‘অসত্য ও চাঞ্চল্যকর’ দাবি থাকতে পারে।
উল্লেখ্য, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পাঁচদিন আগে এপস্টেইন-সংক্রান্ত কিছু নথি প্রকাশ করা হয়, যা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর বিষয়টি অনেকটাই আড়ালে চলে যায়।
এদিকে কংগ্রেসে এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট পাসে ভূমিকা রাখা রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসি বলেছেন, বিশ্বের অন্য প্রান্তে কোনো দেশে বোমা হামলা করলেই এপস্টেইন ফাইলের বিষয়টি অদৃশ্য হয়ে যাবে না। একই সঙ্গে তিনি যুদ্ধেরও সমালোচনা করেন।