চিনি ও কৃত্রিম সুইটেনার দিয়ে তৈরি খাবারকে স্বাস্থ্যকর করার চেষ্টা বহুদিনের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, জনপ্রিয় অনেক শূন্য ক্যালরির কৃত্রিম সুইটেনারও স্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানীরা একটি নতুন প্রাকৃতিক চিনির সন্ধান পেয়েছেন, যা মিষ্টি, কম ক্যালরিযুক্ত এবং রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা হঠাৎ বাড়ায় না।
এই প্রাকৃতিক চিনির নাম ট্যাগাটোজ। স্বাদের দিক থেকে এটি সাধারণ টেবিল চিনির প্রায় ৯২ শতাংশ মিষ্টি, কিন্তু ক্যালরি মাত্র এক-তৃতীয়াংশের মতো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি খেলে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা তেমন বাড়ে না। ফলে ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার সমস্যা আছে এমন মানুষের জন্য এটি ভবিষ্যতে ভালো বিকল্প হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা কয়েকটি জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে একটি প্রাথমিক গবেষণা চালিয়েছেন। এতে দেখানো হয়েছে, পরিবেশবান্ধব ও কার্যকর উপায়ে বড় পরিসরে ট্যাগাটোজ উৎপাদন করা সম্ভব। এতদিন এই চিনির বাজার বিস্তৃত না হওয়ার প্রধান কারণ ছিল উৎপাদন প্রক্রিয়ার জটিলতা ও উচ্চ খরচ।
ট্যাগাটোজ প্রকৃতিতে খুবই বিরল। কিছু দুগ্ধজাত খাবার ও ফলের মধ্যে অল্প পরিমাণে এটি পাওয়া যায়। সাধারণ চিনি ও কৃত্রিম সুইটেনারের তুলনায় এটি তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যসম্মত, কারণ সেগুলো রক্তে ইনসুলিন দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ট্যাগাটোজের একটি বড় অংশ বৃহদান্ত্রে গাঁজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভেঙে যায়। ক্ষুদ্রান্ত্র দিয়ে এটি অল্প পরিমাণে রক্তে শোষিত হয়। এ কারণেই ইনসুলিনের ওপর এর প্রভাব কম। শরীরে এটি অনেকটা ফলের চিনি ফ্রুক্টোজের মতো ভাঙে। তাই যাদের ফ্রুক্টোজ সহ্য হয় না, তাদের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ট্যাগাটোজকে সাধারণভাবে নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এই চিনির আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো দাঁতের জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। সাধারণ চিনি মুখের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাড়িয়ে দাঁতের ক্ষয় ঘটায়। প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, ট্যাগাটোজ সেই ক্ষতিকর জীবাণুর বৃদ্ধি সীমিত করতে পারে। এমনকি মুখের ভালো ব্যাকটেরিয়ার জন্য এটি উপকারীও হতে পারে।
এ ছাড়া ট্যাগাটোজ দিয়ে বেক করা খাবার তৈরি করা যায়, যা অনেক কৃত্রিম সুইটেনারের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। ফলে বিস্কুট, কেক বা অন্যান্য বেকারি পণ্যে এটি ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে।
গবেষকরা ব্যাকটেরিয়ার ভেতরে বিশেষ এনজাইম ব্যবহার করে ট্যাগাটোজ উৎপাদনের একটি নতুন পদ্ধতি তৈরি করেছেন। স্লাইম মোল্ড থেকে পাওয়া একটি এনজাইম ব্যবহার করে তারা সাধারণ গ্লুকোজকে ধাপে ধাপে ট্যাগাটোজে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন। এই পদ্ধতিতে উৎপাদনের সাফল্যের হার প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা আগের পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি।
গবেষণা দল জানিয়েছে, উৎপাদন প্রক্রিয়াটি আরও উন্নত করার কাজ চলছে। ভবিষ্যতে এই কৌশল ব্যবহার করে ট্যাগাটোজ ছাড়াও অন্যান্য বিরল ও উপকারী চিনি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, আগামী এক দশকের মধ্যে বিশ্ববাজারে ট্যাগাটোজের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
ট্যাগাটোজ নিয়ে এই গবেষণা দেখাচ্ছে, স্বাস্থ্যসম্মত মিষ্টির বিকল্প খোঁজার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। কম ক্যালরি, কম ইনসুলিন প্রতিক্রিয়া, দাঁতের জন্য তুলনামূলক নিরাপত্তা এবং রান্নায় ব্যবহারযোগ্যতা এই চিনিকে ভবিষ্যতের খাদ্যশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে। যদিও এখনো এটি ব্যাপকভাবে বাজারে আসতে সময় লাগবে, তবুও ডায়াবেটিস ও স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের জন্য ট্যাগাটোজ হতে পারে একটি আশাব্যঞ্জক প্রাকৃতিক সমাধান।