নির্বাচন সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন করতে সমন্বিত প্রচেষ্টার বিকল্প নাই
Reporter Name
Update Time :
Sunday, January 11, 2026
23 Time View
নির্বাচন সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন করতে সমন্বিত প্রচেষ্টার বিকল্প নাই
গণতন্ত্রের সারবত্তা কেবল ব্যালট বাক্সে ভোট প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় এবং আস্থার পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের ভাষায়, একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে তার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের আসন্ন নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি ৫ আগস্ট পরবর্তী রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের অগ্নিপরীক্ষা। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে যে নতুন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হলো এই নির্বাচন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, রাষ্ট্র হলো সেই প্রতিষ্ঠান যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে ‘বৈধ সহিংসতার চূড়ান্ত ক্ষমতার’ (Monopoly of the legitimate use of physical force) অধিকারী। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা...
গণতন্ত্রের সারবত্তা কেবল ব্যালট বাক্সে ভোট প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় এবং আস্থার পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের ভাষায়, একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে তার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের আসন্ন নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি ৫ আগস্ট পরবর্তী রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের অগ্নিপরীক্ষা। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে যে নতুন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হলো এই নির্বাচন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, রাষ্ট্র হলো সেই প্রতিষ্ঠান যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে ‘বৈধ সহিংসতার চূড়ান্ত ক্ষমতার’ (Monopoly of the legitimate use of physical force) অধিকারী। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনি তফশিল চলমান থাকলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে উন্নতি হওয়া প্রয়োজন ছিল, তা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ধুঁকতে থাকে, তখন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। জনপদে রক্তক্ষরণ ও লাশের মিছিল যখন দীর্ঘ হয়, তখন রাষ্ট্রের সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
রাজধানীতে প্রকাশ্যে জুলাই যোদ্ধা ও ঢাকা-৮ এর এমপি প্রার্থী হিসেবে মাঠে প্রচার চালানো শহীদ শরিফ ওসমান হাদি এবং ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা। এছাড়াও ঢাকার বাইরে যশোরের মালিহাটে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলিবর্ষণ থেকে শুরু করে লক্ষ্মীপুর, জয়পুরহাট বা ঈশ্বরদীতে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাতে যেভাবে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে, তা কোনো দলীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক জননিরাপত্তার এক চরম বিপর্যয়। যখন একজন নাগরিককে দিবালোকে হত্যার পর অপরাধীরা অনায়াসে পালিয়ে যায়, তখন তা প্রমাণ করে যে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি কতটা ভয়াবহ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি কতটা শিকড় গেড়েছে। সীতাকুণ্ডের মতো শিল্পাঞ্চলে বা গ্রামাঞ্চলের নিভৃত জনপদে এই ধরনের নৃশংসতা কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যা নয়, বরং পুরো এলাকার সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর ভীতি ও আস্থাহীনতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ধরণ—যেমন কুপিয়ে বা গুলি করে হত্যা—আমাদের আদিম বর্বরতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, অপরাধী চক্র রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তোয়াক্কা করছে না, যা একটি আসন্ন নির্বাচনের আগে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও জানমালের নিরাপত্তার জন্য এক চরম হুমকি।
এই প্রতিটি হত্যাকাণ্ড একটি চেইন রিঅ্যাকশনের মতো কাজ করছে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে একে বলা হয় ‘স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স (Structural Violence) বা কাঠামোগত সহিংসতা। যখন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা একের পর এক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তখন সাধারণ ভোটারের মধ্যে এক ধরনের চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক সহিংসতার একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও উদ্বেগজনক দিক হলো—”একের পর এক নেতাকর্মী হত্যায় ‘নীরব’ বিএনপি, তৃণমূলে বাড়ছে হতাশা।” একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে এই নীরবতা বা কার্যকর প্রতিরোধের অভাব অপরাধীদের আরও বেশি উৎসাহিত করছে।
তৃণমূলের কর্মীরা যখন দেখে যে তাদের প্রাণের নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র এবং তাদের নিজ নিজ দল ব্যর্থ হচ্ছে, তখন তারা পুরো রাজনৈতিক ও নির্বাচনি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘এনোমি’ (Anomie) বা লক্ষ্যহীনতা। এই হতাশা নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই রহস্যজনক নীরবতা কি কোনো বৃহত্তর সমঝোতা নাকি সাংগঠনিক দুর্বলতা—তা এখন গভীর গবেষণার দাবি রাখে।
এই অস্থিতিশীলতার মূলে রয়েছে ৫ আগস্ট পরবর্তী নজিরবিহীন প্রাতিষ্ঠানিক বিপর্যয়। বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী দীর্ঘ দেড় দশক ধরে যেভাবে দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তার ফলে বাহিনীর চেইন অফ কমান্ড কার্যত ভেঙে পড়েছিল। সমাজতাত্ত্বিক ভাষায় একে বলা হয় ‘ইনস্টিটিউশনাল ট্রমা’ (Institutional Trauma)।
থানাগুলোতে আক্রমণ এবং পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক জড়তা (Psychological Inertia) তৈরি হওয়ার ফলে যে ‘সিকিউরিটি গ্যাপ’ বা নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি। এই শূন্যতাকে পুঁজি করেই যশোর থেকে লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। নির্বাচনের সময় যখন পুলিশই মূলত ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’ হিসেবে কাজ করার কথা, সেখানে তাদের এই হীনম্মন্যতা ও সক্ষমতার অভাব পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি জনগণের মধ্যে গভীর আস্থার সঞ্চার করেছে। সরকার পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। সেনাবাহিনী তাদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। সরকার এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে যে সমন্বয় চলছে, তাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে যাতে কোনো অশুভ শক্তি মাঠ দখল করতে না পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি ‘গ্রে জোন’ (Gray Zone) হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এখানে রাষ্ট্র তার পূর্ণ শক্তি (সেনাবাহিনী) প্রয়োগ করছে, আবার সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (পুলিশ) তার পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারছে না।
দেশের প্রথিতযশা বিশেষজ্ঞগণ বর্তমান পরিস্থিতিকে যেভাবে দেখছেন- তা হলো ৫ আগস্ট পরবর্তী লুণ্ঠিত অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার না হওয়া এই সহিংসতার মূল জ্বালানি।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব এবং জিরো-সাম গেম (Zero-sum game) রাজনীতিই তৃণমূলের এই রক্তক্ষরণের প্রধান কারণ।
বর্তমান সময়েও দেখা যাচ্ছে, ছদ্মবেশী রাজনৈতিক ছত্রছায়া অনেক দাগি অপরাধী পুনরায় সংগঠিত হচ্ছে। নির্বাচনের তফশিল ঘোষিত হওয়ার পর এই মেরূকরণ আরও তীব্র হয়। একেকটি জনপদ তখন রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যদি রাষ্ট্র তার সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই মেরূকরণ ও দুর্বৃত্তায়নের যোগসূত্র ছিন্ন করতে না পারে, তবে সাধারণ ভোটারের জন্য ভোটকেন্দ্রে যাওয়া একটি অগ্নিপরীক্ষায় পরিণত হবে।
পাহাড়ের জটিল ভূ-প্রকৃতি ও আঞ্চলিক রাজনীতির কারণে সেখানে সেনাবাহিনীর ভূমিকা আরও বেশি অপরিহার্য। পাহাড়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সমতলের চেয়ে ভিন্ন। সমতলের এই হত্যাকাণ্ডগুলোর আঁচ যদি পাহাড়েও পৌঁছায়, তবে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর বিশেষ ‘সার্জিক্যাল অপারেশন’ এখন সময়ের দাবি।
একটি সার্থক নির্বাচনের জন্য চারটি প্রধান স্তম্ভের মধ্যে ‘সিনার্জি’ (Synergy) বা সম্মিলিত শক্তি প্রয়োজন। যেমন-
১. নির্বাচন কমিশন (EC): প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের কঠোর তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকায় দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা।
২. সরকার: সেনাবাহিনীকে কেবল ‘স্ট্যাটিক গার্ড’ হিসেবে নয়, বরং ‘মোবাইল ম্যাজিস্ট্রেসি’ হিসেবে কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া।
৩. আইনশৃঙ্খলা বাহিনী (পুলিশ, র্যাব): দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করা।
৪. সেনাবাহিনী: আস্থার চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে বিচারিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে খুনিদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা।
উত্তরণের পথ হিসেবে এখানে কিছু বিষয় ফলো করা যায়। যেমন- চিরুনি অভিযান। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘হটস্পট’গুলোতে অবিলম্বে যৌথ বাহিনীর চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা। সেসব স্থানে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারের দৃশ্যমান প্রয়োগ করা জরুরি। অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করা।
৫ আগস্টের পর থেকে লুণ্ঠিত এবং নতুন করে মজুত করা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে দেশব্যাপী বিশেষ ক্র্যাকডাউন শুরু করা এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা। হত্যার ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে ‘প্রি-এম্পটিভ অ্যাকশন’ বা হত্যার পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করা।
পরিশেষে বলা যায়, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যটি কেবল কোনো একটি গোষ্ঠীর নয়, বরং এটি পুরো জাতির। যশোর, জয়পুরহাট বা লক্ষ্মীপুরের প্রতিটি ফোঁটা রক্ত আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আমাদের সেনাবাহিনীকে আন্ডারএস্টিমেট না করে তাদের সক্ষমতাকে পূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে এবং পুলিশ বাহিনীকে সুশৃঙ্খলভাবে মাঠে সক্রিয় করার মাধ্যমেই কেবল একটি সুন্দর নির্বাচনের পথে আমরা এগোতে পারি।
রাষ্ট্র যদি তার সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে দুর্বৃত্তদের দমনে ব্যর্থ হয়, তবে গণতন্ত্রের নামে প্রহসন মঞ্চস্থ হবে। সুন্দর নির্বাচনের পথে হাঁটতে হলে সমন্বিত এই প্রচেষ্টাই আমাদের শেষ ভরসা। ইতিহাসের দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্রকে এখনই তার ‘বৈধ সহিংসতার চূড়ান্ত ক্ষমতা’ প্রয়োগ করে জনপদে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে।