অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের আধিপত্য থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। ভারতের যে আগ্রাসী একটা ভূমিকা ছিল সব জায়গায়, সেখান থেকে জনগণ এখন স্বাধীন কণ্ঠে কথা বলতে পারছে বলেও জানান তিনি।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)-আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ শীর্ষক পলিসি ডায়ালগে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, অবশ্যই সমালোচনার কিছু কিছু যৌক্তিক দিক আছে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সমালোচনাটা নির্দয় পর্যায়ে চলে যায়। ধরুণ, ১০টা কাজের মধ্যে সরকার ৪টা সম্পন্ন করেছে। এক্ষেত্রে আপনারা বলেন যে, ৪টা করেছে এবং ৬টা করতে পারেনি। সেটার জন্য সমালোচনা করেন। কিন্তু এরকম কিছুই দেখবেন না।
বিচার বিভাগের সংস্কারের কথা উল্লেখ করে আসিফ নজরুল বলেন, এখন বিচার বিভাগে পদ সৃষ্টি, বদলি, পদোন্নতি, বাজেট অ্যালোকেশনসহ সবকিছু উচ্চ আদালতে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা কি সংস্কার না? রাষ্ট্রের এত বড় একটা অঙ্গের বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এটা কোনো সংস্কার না? এটা কি আপনাদের মনে হয় না বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় একসময় ভূমিকা রাখবে? সংস্কার ম্যাজিক লাইট না যে সঙ্গে সঙ্গে ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, আমরা একটা গুম কমিশন করেছি। এটা অসাধারণভাবে কাজ করেছে। এই কমিশনের অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা একটা হিউম্যান রাইটস কমিশন ল’ করেছি। আমি আপনাদের প্রত্যয়ের সঙ্গে বলি, দক্ষিণ এশিয়ার যে কোনো হিউম্যান রাইটস আইনের চেয়ে আমাদের আইনটা বেটার হয়েছে। আমরা এই আইন অনুযায়ী অচিরেই হিউম্যান রাইটস কমিশনে নিয়োগ দিতে যাচ্ছি। এটা কি কোনো সংস্কার না? আমাদের এই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে প্রত্যাশা ম্যানেজমেন্ট একটা বিশাল ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনুষ্ঠানে ড. আসিফ নাজরুল ছাড়াও অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন, সিনিয়র সাংবাদিক মো. মুকতাদির রাশিদ রোমিও, বাংলাদেশ সোশ্যালিস্ট পার্টির (বিএসএডি) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. গোলাম মোস্তফা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করিম মারুফ, এ বি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসরিন সুলতানা মিলি, সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী, গণতান্ত্রিক অধিকার পরিষদের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফরুক হাসান, সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, কপায়েং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা, বিএনপির নেতা ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান, সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম সদস্য রাগিব আহসান মুননা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক কর্মী মোশাররফ আহমেদ ঠাকুরসহ প্রমুখ।
ড. ইফতেখার ‘জুলাই সনদ’ গণভোট সম্পর্কে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘জুলাইসনদ না হলে স্কার কার্যক্রম সফল হবে না। ৫ আগস্টের আন্দোলন সম্পূর্ণ বৃথা যাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে তথা হ্যাঁ ভোটের পক্ষে। কারও সাহস থাকলে সামনা সামনি বলুক আমি গণভোটের ‘না’ ভোটের পক্ষে বা গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে।’
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘মানবাধিকারকে বিশ্বজনীন এবং আপেক্ষিক নয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলি অর্থ, ক্ষমতার মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে, আর রাষ্ট্র এসবের মাধ্যমে গু-ামি শক্তিকে উৎসাহিত করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আত্মসমালোচনার আহ্বান জানিয়ে আদিবাসী জনগণের অধিকার তাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে অন্তর্ভুক্ত করার তাগিদ দেন তিনি।
ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন সেকশন ৫৪ সংশোধনের পরও তার প্রয়োগের গভীর সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকরা এখন গুম ও হত্যার খবর প্রচার করতে ভয় পাচ্ছেন এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতার প্রতি তাদের সর্মথন যাচাই করতে আহ্বান জানান।