দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশেষ করে যুবনেতা শহীদ শরীফ উসমান হাদীর গুলিবিদ্ধ পর ব্যাপক আন্দোলন উত্যক্ত হয়েছে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত শাহাদাতের তামান্নায় জাতিকে হতভম্ব করে ঐতিহাসে স্মরণকালের বৃহত্তম জানার রেকর্ড তৈরি করে দেশবাসীর অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন পরপারে। শহিদ ওসমান হাদীর মৃত্যু এবং ঐতিহাসিক জানাজার উপস্থিতি
মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট ফেরারি হাসিনা গণ এবং তাদের তাবেদারকে কঠিন মেসেজ পৌঁছে দিয়েছে যে হত্যার খুন, ঘোম অগ্নি সন্ত্রাস কিংবা কোনো আগ্রাসনের ভয় প্রদর্শন করে আজকের তরুণ এবং ছাত্র যুব সমাজকে নিথর নিস্তব্ধ করা যাবে না।
যদিও বাংলাদেশ আজ এক জটিল সময়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক অবক্ষয় এবং সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তি—সব মিলিয়ে জাতি যেন এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। কিন্তু ইতিহাস বলে, কোনো জাতির প্রকৃত জাগরণ কখনো আরামের সময়ে হয় না; বরং চরম সংকটই জন্ম দেয় নতুন সম্ভাবনার, নতুন নেতৃত্বের এবং নতুন পথচলার।
বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট হলো
আস্থার অভাব। রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে প্রশাসন, বিচার ও গণমাধ্যম—প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে। গণতন্ত্র কাগজে থাকলেও বাস্তবে তার চর্চা সংকুচিত হয়েছে, ফলে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে। এই রাজনৈতিক সংকট রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল—পি এম পি ও জামায়াত ইসলামের মধ্যে সর্বস্তরে কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে। একে অপরের ওপর নির্বাচন বানচালের দায় চাপিয়ে তারা দেশকে ক্রমেই সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে উপদেষ্টা পরিষদ, সচিবালয়ের কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের প্রতি জনআস্থার গুরুতর সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ হবে এবং আদৌ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা সম্ভব কি না—সে প্রশ্ন এখন অভিজ্ঞ ও সচেতন মহলে জোরালোভাবে উঠছে।
বর্তমান এই অবস্থায় শেষ আশার প্রতীক হিসেবে অনেকের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দিকে। তবে বড় প্রশ্ন হলো—তিনি কি এই আস্থা ধরে রাখতে পারবেন?
ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত সততা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও নৈতিক অবস্থান নিঃসন্দেহে তাঁর শক্তি। কিন্তু দেশের জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ এবং দলীয় স্বার্থের সংঘাতে সেই আস্থা বহাল রাখা সহজ হবে না। নিরপেক্ষ অবস্থান, সাহসী সিদ্ধান্ত এবং দৃশ্যমান সংস্কারই কেবল প্রমাণ করতে পারে—এই আস্থা সাময়িক নয়, টেকসই।
তবুও এই অন্ধকারের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আলোর সম্ভাবনা। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগ পেলে এই তরুণরাই পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি, উদ্যোক্তা সংস্কৃতি ও ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার বিস্তার ইতোমধ্যে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। রাষ্ট্র যদি দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ায়, তবে এই তরুণ শক্তিই সংকটকে সম্ভাবনায় রূপ দিতে পারে।
একইভাবে অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার চিন্তা আজ আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। দেশীয় উৎপাদন, কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পে জোর দেওয়া, বিকল্প বাজার ও বহুমুখী বাণিজ্যনীতি গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নির্ভরশীলতা কমাতে পারে। সংকট আমাদের শিখিয়েছে—নিজের পায়ে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে জনসচেতনতার উত্থানে। মানুষ আজ প্রশ্ন করছে, ভাবছে, তুলনা করছে। এই সচেতনতা যদি সংগঠিত ও দায়িত্বশীল পথে পরিচালিত হয়, তবে তা রাষ্ট্র সংস্কারের শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। ইতিহাস সাক্ষী, জনগণের জাগরণই সব বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে।
অতএব, বাংলাদেশের বর্তমান সংকটকে কেবল হতাশার চোখে দেখলে চলবে না। এই সংকটই আমাদের সামনে আয়না ধরে দাঁড় করিয়েছে—আমাদের দুর্বলতা দেখিয়েছে, আবার সম্ভাবনার পথও চিনিয়ে দিয়েছে। প্রয়োজন সৎ নেতৃত্ব, দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব এবং জাতীয় ঐক্য। কারণ সংকটের ভেতর দিয়েই সম্ভাবনার জন্ম হয়, আর সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।
জাতি হিসেবে আমরা আশাবাদী, এই কারণ যে দেশের মাটিতে বারবার জন্ম নেয় শহীদ নূর হোসেন, আবরার, আবু সাঈদ, শরিফ ওসমান সাদীর মতো তরুণেরা। তাঁদের আত্মত্যাগই আমাদের বিশ্বাস জাগিয়ে রাখে—লাল রক্তে রাঙানো জাতীয় পতাকা কখনো ম্লান হবে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই পতাকাকে চিরসমুন্নত রাখতে বুক পেতে দেবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, এবং দেশের মর্যাদা রক্ষায় অবিচল থাকবে।
মিসবাহ উদ্দিন আহমদ
নিউইয়র্ক