মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এবার নতুন এক কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে সামনে এসেছে ‘তেল’। পারস্য উপসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্ববাজারে এক ফোঁটা তেলও যেতে দেওয়া হবে না— এমন কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।
তেহরানের দাবি, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা এবং সংঘাতের জেরে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। কেন পরিস্থিতি এতটা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এবং কেন ইরান এমন ঘোষণা দিল— এ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
গতকাল বুধবার (১১ মার্চ) আইআরজিসির খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দপ্তরের এক মুখপাত্র জানান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল কিংবা তাদের মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে কোনো জাহাজ এখন থেকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিবৃতির মাধ্যমে তিনি বলেন, “কৃত্রিমভাবে তেলের দাম কমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলারে পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুত থাকুন। তেলের দাম নির্ভর করে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর, আর এই অঞ্চলের অস্থিরতার মূল উৎস যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা।”
যুদ্ধের প্রভাব ও অস্থির তেলের বাজার
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সংঘাতের এখনও কোনো সমাধান না হওয়ায় তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার পাশাপাশি তার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে তেলের দাম ব্যাপক ওঠানামা করছে।
বিশ্বে পরিবাহিত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপাদন কমে গেলে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বুধবার ওমান উপকূলের কাছে একটি থাই পতাকাবাহী কার্গো জাহাজসহ মোট তিনটি জাহাজে হামলার খবরও পাওয়া গেছে।
এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
বুধবার তিনি বলেন, “আমার মনে হয় তাদের যাওয়া উচিত। খুব দ্রুতই সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।”
মানবিক সংকটের আশঙ্কা
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার সতর্ক করে বলেছেন, এই অচলাবস্থার কারণে সাব-সাহারান আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে জরুরি সহায়তা পৌঁছানো ব্যাহত হচ্ছে। তিনি ত্রাণবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য এই জলপথে বিশেষ ছাড় দেওয়ার আহ্বান জানান।
তার ভাষায়, “আমরা অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।”
বাজার স্থিতিশীল রাখতে জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়
যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব সামাল দিতে উন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিভিন্ন পদক্ষেপ বিবেচনা করছে।
কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান বুয়েগার বলেন, “হরমুজ প্রণালী দ্রুত খুলে না দিলে ইউরোপ ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে।”
এ দিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, বাজার স্থিতিশীল রাখতে তাদের ৩২টি সদস্য রাষ্ট্রের জরুরি মজুত থেকে একযোগে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল বলেন, “বাজার পরিস্থিতি সামাল দিতে এটি একটি বড় পদক্ষেপ। তবে হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সরবরাহ পুরোপুরি স্থিতিশীল হবে না।”
এই সিদ্ধান্তের পর জার্মানি, অস্ট্রিয়া এবং জাপান তাদের জাতীয় মজুত থেকেও তেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জানিয়েছেন, তাদের দেশের মোট তেল আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশই আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। আগামী সোমবার থেকেই সংরক্ষিত তেল বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স