January 16, 2026, 12:35 am

আপসহীন নেত্রীর মহাপ্রস্থান

Reporter Name
  • Update Time : Thursday, January 1, 2026
  • 40 Time View

উপসংহার ঘটল বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের। স্বামী জিয়াউর রহমানের জানাজাস্থল ঢাকার মানিক মিয়াতেই হলো বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা। এরপর স্বামীর পাশেই কবর। জমায়েতের ভারে আক্রান্ত ঢাকা। আগের সপ্তা‌হে লাখ লাখ মানুষ ঢাকায় জমায়েত হয় আবেগ-উচ্ছ্বাসে তার ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বরণ করতে। এরও আগে হ‌য়ে‌ছি‌ল বিষা‌দে, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হাদির জানাজা পড়তে। এবারের জমায়েতও বিদায় ও বিষাদের। নির্বাচনকে ঘিরে সামনেও জমায়েতের বিশাল ট্রেনে কেবল ঢাকা নয়, গোটা বাংলাদেশ।
এসব জমায়েতের কোনটা বিষাদের বা আনন্দের- সেই জিজ্ঞাসা থেকেই যাচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়ার জীবনে সবচেয়ে বড় সার্থকতা দুনিয়ার জীবনে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ইতিহাসে তিনি অমর চরিত্র।
তার আরেক সার্থকতা, ফ্যাসিবাদবিরোধী যে আন্দোলন করে গেছেন, মৃত্যুর আগে এর শেষ দেখে যেতে পারা। বিএনপির এ শূন্যতার মাত্র কদিন আগে ছিল পূর্ণতার খবর। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের ঘোষণা ছিল : আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান। সেই প্ল্যানের বৃত্তান্ত নিয়ে জিজ্ঞাসার মাঝে ভোটার লিস্টে উঠল তার নাম। প্রার্থী হয়েছেন ঢাকা-বগুড়া মিলিয়ে দুই আসনে। এর মাঝেই বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুসংবাদ। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণতায় বিশেষ মর্যাদা ও সিকিউরিটির মাঝেই জীবনাবসান। মৃত্যুর পরও রাজসম্মান। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা। পরিস্থিতি নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ বৈঠক। বৈঠকের সিদ্ধান্তদৃষ্টে নির্বাহী আদেশে বুধবার সরকারি ছুটিও ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে প্রথা ভেঙে বিএনপির মহাসচিবকে আমন্ত্রণ করে নেওয়া। এর আগে জাতির উদ্দেশে ভাষণে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অর্জন ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে জাতি এক মহান অভিভাবককে হারিয়েছে। স্বৈরাচার হটানোসহ বিভিন্ন আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘দেশ ও জাতির প্রতি তার সমুজ্জ্বল অবদান জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
ড. ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইনের চলতি পথেই তারেক রহমানের প্ল্যান। তার এ প্ল্যান বাস্তবায়ন অবশ্যই নির্বাচনের পরের বিষয়। তবে শুরুটা নির্বাচনের আগেই দৃশ্যমান হতে থাকে। চলনে-বলনে এক ব্যতিক্রম এবং অন্য রকম তারেক রহমানকে দেখতে থাকে বাংলাদেশ। যেখানে যাচ্ছিলেন সেখানেই পঙ্গপালের মতো মানুষের ছুটে যাওয়া। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস সাধারণ মানুষের। অভিবাদনের জবাবে হাত নাড়তে নাড়তে কাহিল হয়ে পড়লেও এর প্রকাশ ঘটছিল না। মিলছিল না মুখের হাসি। হাইটের সঙ্গে যোগ হতে থাকে নতুন হাইপও। তারেক রহমানকে নিয়ে এ হাইপ-হাইটের পথেই খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শোক। মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তার পক্ষ থেকে একটি শোকবার্তা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর অবদান অপরিসীম। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে এবং বিএনপি নেতৃত্বের এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো। খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান ও পরিবারের অন্য শোকাহত সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানিয়ে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও একটি পোস্ট দেওয়া হয়েছে। সেখানে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে।
গণমাধ্যমগুলোতে শেখ হাসিনা ও তার ছেলে জয়ের এ শোক গুরুত্ব পায়নি। বরং এর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পেছনে শেখ হাসিনার দায় নিয়ে দেওয়া আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বক্তব্য ও সরকারের তাৎক্ষণিক ভূমিকা। আসিফ নজরুল বলেছেন, আওয়ামী সরকার বেগম জিয়াকে প্রহসনমূলক রায় দিয়ে কারাগারে অকথ্য নির্যাতন করেছে। তাঁর মৃত্যুর পেছনে ফ্যাসিস্ট সরকার ও শেখ হাসিনার দায় রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে মঙ্গলবার সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ বৈঠক হয়। এতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ আমন্ত্রণে যোগ দেন। বেগম জিয়ার মৃত্যুর পর পরবর্তীতে দলের করণীয় সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টাকে অবহিত করেন দলটির মহাসচিব। যমুনা থেকে বেরিয়ে কথা বলেন গণমাধ্যমের সঙ্গে। বৈঠকের বিস্তারিত জানান আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে কারাদণ্ড দিয়ে যে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, উচ্চ আদালতে তা প্রমাণ হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। নির্বাচনী ডামাডোলের কারণে আসিফ নজরুলের বক্তব্য সমর্থন করে বিএনপির দিক থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে আসবে নিশ্চিত। কারণ, কারাগারে থাকাকালে বেগম খালেদা জিয়াকে পয়জন পুশ করা হয়েছে, এ অভিযোগ বিএনপি সেই কবে থেকেই করে আসছে। সরকার-ঘোষিত তিন দিন এবং বিএনপির ৭ দিনের শোক কর্মসূচির কারণে নির্বাচনী শোরগোলে কিছুটা বাধা পড়েছে। তবে কথার দিক থেকে ভোটের ট্রেন থেমে নেই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়ার পক্ষে দাখিল করা তিনটি আসনে নতুন করে তফসিল ঘোষণা করতে হবে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে আনতে দেরি হয়নি। তার মৃত্যুর আগের দিন সোমবার ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। খালেদা জিয়ার পক্ষে বগুড়া-৭, দিনাজপুর-৩ ও ফেনী-১ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। এই তিন আসনে বিএনপির একজন করে বিকল্প প্রার্থীও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এরই মধ্যে পরদিন মঙ্গলবার ভোর ছয়টায় খালেদা জিয়া মারা যান। জাতীয় নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা আছে, প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি, এমন কোনো বৈধভাবে মনোনীত প্রার্থীর মৃত্যু হলে ওই আসনে নতুন করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তিনটি আসনে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র জমা হলেও তিনি বা কেউ এখনো বৈধ প্রার্থী হননি। কারও মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে টিকে যাওয়ার পর তিনি বৈধ প্রার্থী বিবেচিত হন। খালেদা জিয়া মারা যাওয়ায় তাঁর মনোনয়ন স্থগিত থাকবে। বৈধভাবে মনোনীত ঘোষণার পর কোনো প্রার্থীর মৃত্যু হলে সেখানে আবার তফসিল ঘোষণা করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সেটা করতে হবে না। কোনো আসনে কোনো দল একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন দিতে পারে। তবে একাধিক প্রার্থী থাকলে প্রতীক বরাদ্দের আগে যার নামে দল থেকে প্রতীক বরাদ্দের চিঠি দেওয়া হয়, তিনিই দলীয় প্রার্থী হন। তাই খালেদা জিয়ার নামে তিন আসনে নতুন করে তফসিল ঘোষণার দরকার হবে না। এর পরও খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের তফসিলে পরিবর্তন আনার দাবি তুলে অতিরাজনীতির ফাঁক খোঁজার লোক ও মহল রয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © ajkerdorpon.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com