July 2, 2026, 1:18 am

‌‘আমি খণ্ডিত লা\শের বাবা হতে চাইনি’

Reporter Name
  • Update Time : Sunday, June 7, 2026
  • 30 Time View

‘আমি একজন ধর্ষিতার বাবা, একজন খণ্ডিত লাশের বাবা। কিন্তু আমি তো এভাবে পরিচিত হতে চাইনি। আমি গর্বিত পিতা হয়ে থাকতে চেয়েছিলাম।’ রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার শিকার ৮ বছর বয়সি শিশুর বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ কথাগুলো বলেছেন।

শনিবার রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি একথা বলেন। পল্লবীর এ শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ১৯ দিনের মাথায় আদালত আজ রায় দিতে যাচ্ছেন।

বিএনপির উদ্যোগে গঠিত ‘নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেল’ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকের শুরুতে পল্লবীতে হত্যার শিকার শিশুর বাবা বলেন, এক ফ্ল্যাটের দরজা থেকে আরেক ফ্ল্যাটের দরজার দূরত্ব মাত্র তিন ফুট। এ তিন ফুটের মধ্যেও যদি আমরা একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারি তাহলে শুধু সরকারকে দায়ী করলে হবে না।

তিনি বলেন, আমি জানতে চাই- এ দায়িত্ব কে নেবে? এ দায়িত্ব কি আমার অবহেলা, সমাজের অবহেলা, না রাষ্ট্রের অবহেলা? আমি তো একজন ধর্ষিতার বাবা হয়ে থাকতে চাই না। আমি তো গর্বিত পিতা হয়ে থাকতে চেয়েছি। আপনারা আমাকে সেই নাম ফিরিয়ে দিন। আমাকে সেই সম্মান ফিরিয়ে দিন।’

শিশুটির বাবা বলেন, আমাকে কেউ আর আমার নামে চেনে না। আমাকে একজন ধর্ষিতার বাবা হিসাবে চেনে। খণ্ডিত লাশের বাবা হিসাবে চেনে, আমি কি তার জন্য দায়ী। কিন্তু আমি তো এভাবে পরিচিত হতে চাইনি। আমি গর্বিত পিতা হয়ে থাকতে চেয়েছিলাম। এ কথাগুলো বলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

তিনি বলেন, আমি আমার বাচ্চার হত্যাকারীর সুষ্ঠু বিচার চাই। একজন বাবা হিসাবে এটাই আমার একমাত্র চাওয়া। বাংলাদেশ সরকার দ্রুত বিচার শেষ করার যে আশ্বাস দিয়েছিল, তার প্রতিফলন আমি দেখতে পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, আশা করি এ রায় বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। একজন বাবা হিসাবে আমি সর্বোচ্চ শাসি্ত প্রত্যাশা করছি। সেই শাসি্ত যেন দ্রুত কার্যকর হতে দেখি।

শিশুটির বাবা আরও জানান, ঘটনার ১৩ দিন পরও তার স্ত্রী মানসিক ট্রমায় ভুগছেন। আমার স্ত্রী কোথায় যায়, কী বলে, নিজেই জানে না। তাকে প্রতিনিয়ত দেখভাল করতে হচ্ছে। সে সুস্থ হবে কিনা, আল্লাহই ভালো জানেন। তিনি তার বড় মেয়েকে নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তবে শুধু নিজের মেয়ে নয়, সব শিশুকে নিয়েই তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুক্রবার তার বাড়িতে ৫ বছরের একটি মেয়ে এসেছিল। সে ‘ধর্ষণ’ শব্দটি শিখে গেছে। অথচ এ বয়সে এটা তার জানার কথা নয়। সেই শিশুটি এখন একা টয়লেটে যেতেও পারছে না, মায়ের আঁচল ছাড়া এক পাও নড়ছে না। তিনি বলেন, এটাই আজকে বাংলাদেশের শিশুদের মনের অবস্থা। মেয়ে হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন তিনি।

বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম সঞ্চালনায় বৈঠকটিতে আইনজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এতে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। দেশে ক্রমবর্ধমান শিশু নির্যাতন মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত শিশু নিরাপত্তা টাস্কফোর্স গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন পুতুল বলেন, নারী শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এমন সহিংসতা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের সঙ্গে সাধারণ মানুষও সোচ্চার হতে হবে। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সর্বস্থানে নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ৭২ হাজার স্বেচ্চাসেবী সংগঠন রয়েছে- ওদের কাজ কী?

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান বলেন, ধর্ষণের ধরন পরিবর্তন হচ্ছে। সহিংসতা বাড়ছে। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ-সদস্য ও বিএনপির নেত্রী নিপুণ রায় চৌধুরী বলেন, স্মার্ট প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে দেশে সাইবার বুলিং, অনলাইনে হয়রানি ও শিশুদের নিয়ে অশ্লীল কনটেন্ট তৈরির মতো অপরাধ বহুগুণে বেড়েছে। ফলে শিশুরা এখন চার দেওয়ালের মধ্যেও নিরাপদ নয়।

করপোরেট ব্যক্তিত্ব রুবাবা দৌলা বলেন, কারা এ ধরনের অপরাধ করেছে সেটির কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার থাকা প্রয়োজন। আধুনিক প্রযুক্তি ও সমন্বিত নাগরিক তথ্যব্যবস্থা ব্যবহার করে অপরাধের ধরন বিশে্লষণ এবং ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব। গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, আইনজীবী রাশনা ইমাম, সাংবাদিক মাহতাব উদ্দিন, অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, অধ্যাপক সাইমুন নাহার, অধ্যাপক নাহরীন আই খান, চিত্রনায়ক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল প্রমুখ। তারা বলেন, যৌন নির্যাতনসহ সহিংসতা রোধে সামাজিকভাবে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া শিশুদের পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজে ছড়িয়ে পড়া অপরাধ প্রবণতা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

পল্লবীতে শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যা মামলার রায় আজ: পল্লবীতে ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় করা মামলার রায় আজ (রোববার) ঘোষণা করা হবে। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ রায় ঘোষণা করবেন। রায়ে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করছে রাষ্ট্রপক্ষ।

১৯ মে পল্লবীর একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে ধর্ষণের শিকার শিশুটির খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। ফ্ল্যাটটির বাসিন্দা আসামি সোহেল ঘটনার পর বাসার শৌচাগারের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যায়। বাসা থেকে তার স্ত্রীকে তখনই আটক করা হয়। আর সেদিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেলকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় মামলা করেন। শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © ajkerdorpon.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com