বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি অবশেষে স্থগিত করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বেশ কিছু শাস্তিমূলক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের পর আন্দোলনকারীরা তাদের কর্মসূচি থেকে সরে আসেন। এর ফলে সম্প্রতি দুপুর থেকে তারা আবার নিয়মিত চিকিৎসাসেবায় ফিরে যান, যা সাধারণ রোগীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর রাতে একজন রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত অপ্রীতিকর পরিস্থিতির জেরে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। ওই ঘটনার পর হাসপাতালের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ওই সংঘর্ষের অনভিপ্রেত ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত বারোজন ব্যক্তি আহত হন, যা চিকিৎসকদের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এই পরিস্থিতিতে হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার এবং নিজেদের কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার দাবি জানান চিকিৎসকরা। এই চার দফা দাবিতে ওই দিন রাত থেকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির ঘোষণা দেন শজিমেকের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। তাদের এই হঠাৎ কর্মবিরতির কারণে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ছাড়া বহির্বিভাগসহ অন্যান্য নিয়মিত চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হয়। দূরদূরান্ত থেকে আসা সাধারণ রোগীরা চিকিৎসাসেবা না পেয়ে চরম দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্থানীয় প্রশাসন, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন বা বিএমএ নেতৃবৃন্দ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে নানা আলোচনা হলেও শুরুতে চিকিৎসকরা তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। পরবর্তীতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেশ কিছু কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হলে আন্দোলনরত চিকিৎসকরা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়ের করা মামলায় ইতোমধ্যে পুলিশ ছয়জনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। এছাড়া শৃঙ্খলাভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে শাখা ছাত্রদলের পাঁচ নেতাকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, হাসপাতালের ভেতরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে দায়িত্বে অবহেলার দায়ে একজন আনসার সদস্যকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আনসার কমান্ডারসহ মোট বিশজন সদস্যকে তাৎক্ষণিকভাবে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আন্দোলনের অন্যতম প্রতিনিধি ইন্টার্ন চিকিৎসক রিতুল মণ্ডল স্নিগ্ধ জানান, তাদের দাবির বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও সার্বিক পরিবেশ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় তারা সাময়িকভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন এবং পরিবেশ অনুকূল থাকলে চিকিৎসাসেবা অব্যাহত থাকবে। তবে পরিস্থিতি অবনতি হলে তারা পরবর্তীতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
এদিকে, চিকিৎসকদের কর্মবিরতি স্থগিত হলেও পুরো ঘটনা নিয়ে উত্তেজনা পুরোপুরি থামেনি বরং অন্য একটি মোড় নিয়েছে। ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তোলার জেরে রোগীর স্বজন ও পরিচিতদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং দোষীদের বিচার দাবিতে সম্প্রতি বগুড়া প্রেস ক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই ঘটনায় হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টারসহ ত্রিশ থেকে চল্লিশজন ইন্টার্ন চিকিৎসককে আসামি করে বগুড়া সদর থানায় একটি লিখিত অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালটির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ শান্ত রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।