সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল কার্যকরের লক্ষ্যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে। এ কারণে সংশোধিত বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে এক লাখ ছয় হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি জানুয়ারি থেকে আংশিকভাবে হলেও নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের পরিকল্পনা থেকে এই বাড়তি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে এসে নতুন পে-স্কেল কার্যকর করতে না পারলেও পরবর্তী নির্বাচিত সরকার যেন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে– সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে সংশোধিত বাজেট প্রণয়নের সময়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। পরে তা দুই হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয় সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যা গত ২৪ ডিসেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
মূল বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছিল পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে প্রায় পাঁচ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে– অর্থাৎ এ খাতে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয় অর্থাৎ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) খাতে বরাদ্দ দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে করা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, শুরুতে সংশোধিত বাজেট কমিয়ে সাত লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সুদ পরিশোধ ও ভর্তুকি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংক একীভূতকরণে মূলধন সহায়তা, সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন ভাতা বাড়ানো এবং নতুন পে-স্কেলের জন্য অর্থের সংস্থান রাখতে গিয়ে পরিচালন ব্যয় কমানো সম্ভব হয়নি। বরং এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি থাকায় উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে পরিচালন ব্যয় সামাল দেওয়া হচ্ছে।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ ছিল ৮৪ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে এক লাখ ছয় হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা করা হয়েছে। তবে এই অতিরিক্ত ২২ হাজার কোটি টাকার পুরোটা নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য নয়। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ব্যয়ও এই বরাদ্দের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এদিকে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত পে-কমিশন সুপারিশসহ প্রতিবেদন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি সপ্তাহে কমিশনের প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হতে পারে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত বেতন কাঠামোতে মূল বেতন ও ভাতা আলাদা কোডে কার্যকর করা হয়। সে বিবেচনায় জানুয়ারি থেকে অন্তত মূল বেতন বা ভাতা– যে কোনো একটি কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে বাজেটে অর্থ রাখা হয়েছে। বাকি অংশ নির্বাচিত নতুন সরকার বাস্তবায়ন করতে পারে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকায় তারা এটি কার্যকর না করলেও পরবর্তী সরকার যেন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে– সে লক্ষ্যে বাজেটে আগাম প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে প্রজ্ঞাপন জারিতে দেরি হলেও বকেয়া হিসেবে তা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
এ বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ শুক্রবার বিকেলে বলেছেন, পে-স্কেলসংক্রান্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর দ্রুত তা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলা মিনি স্টেডিয়াম পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, পে-স্কেল নিয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।
এর আগে গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা জানান, কমিশন বিভিন্ন পক্ষের লিখিত ও মৌখিক মতামত পর্যালোচনা করছে। সব দিক বিবেচনা করে সুপারিশ তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিবেদন হাতে পেলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৭ জুলাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণে পে-কমিশন গঠন করা হয়। বর্তমানে ২০১৫ সালের পে-স্কেল অনুযায়ী প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন-ভাতা পান। সামরিক বাহিনী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসহ মোট উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে মহার্ঘ ভাতা নিয়ে আলোচনা শুরু করলেও পরে তা স্থগিত হয়। গত জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০১৫ সালের জুলাই থেকে প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট চালু রয়েছে।