ইসলামে হজের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামের মৌলিক পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হজ। যাদের উপর হজ ফরজ হয়েছে তাদের হজ পালন করা অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু হজ করার মতো সম্পদ থাকার পরেও অনেকেই হজ করেন না। অনেকেই বুঝে উঠতে পারেন না যে, কখন তাকে হজ করতে হবে।
জীবনে একবার হলেও আল্লাহর ঘর বায়তুল্লাহ-এ উপস্থিত হয়ে হজ আদায় করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর ফরজ। তবে ‘সামর্থ্য’ শব্দটি নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি দেখা যায়, কত টাকা থাকলে হজ ফরজ হবে, কী ধরনের সম্পদ থাকলে তা বাধ্যতামূলক হবে, কিংবা ঋণ থাকলে কী হবে—এসব বিষয়ে অনেকেরই পরিষ্কার ধারণা নেই।
ইসলামি শরিয়তে হজ ফরজ হওয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট শর্ত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এসব শর্ত পূরণ হলে একজন মুসলমানের জন্য হজ আদায় করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। নিচে সেই শর্তগুলো ও ‘সামর্থ্য’ বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো—
হজ ফরজ হওয়ার মৌলিক পাঁচ শর্ত
১. মুসলমান হওয়া
২. মানসিকভাবে সুস্থ হওয়া
৩. সাবালক হওয়া
৪. স্বাধীন (দাসত্বমুক্ত) হওয়া
৫. সামর্থ্য থাকা
এই পাঁচটির মধ্যে ‘সামর্থ্য’ শর্তটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তব জীবনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
সামর্থ্যের ব্যাখ্যা
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর জন্য এই ঘরের হাজ করা লোকেদের ওপর আবশ্যক, যার সে পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য আছে।’ (সুরা আল ইমরান : ৯৭)
রাজধানীর জামিয়াতুল ইসলামিয়া বায়তুস সালাম-এর সিনিয়র মুফতি মুফতি আবদুর রহমান হোসাইনী বলেন, এখানে ‘সামর্থ্য’ বলতে মূলত দুই ধরনের সক্ষমতাকে বোঝানো হয়েছে। তা হলো, শারীরিক সক্ষমতা ও আর্থিক সক্ষমতা।
শারীরিক সামর্থ্য
হজ ফরজ হওয়ার জন্য ব্যক্তিকে এমন সুস্থ হতে হবে, যাতে তিনি নিজে মক্কায় গিয়ে হজের যাবতীয় আমল আদায় করতে পারেন। গুরুতর অসুস্থতা বা অক্ষমতা থাকলে সেই অবস্থায় হজ ফরজ হয় না।
কতটুকু সম্পদ হলে হজ ফরজ
হজ ফরজ হওয়ার জন্য কেবল ধনী হওয়া জরুরি নয়; বরং নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক শর্ত পূরণ হতে হবে—
১. নিজের মৌলিক প্রয়োজন (খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদি) পূরণের পর অতিরিক্ত অর্থ থাকতে হবে।
ইসলামিক পণ্য
২. হজে যাওয়া-আসা ও সৌদি আরবে থাকা-খাওয়ার খরচ থাকতে হবে।
৩. হজের সময় পরিবারের ভরণপোষণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ রেখে যেতে হবে।
এই শর্তগুলো পূরণ হলে হজ ফরজ হয়ে যাবে।
ঋণ থাকলে করণীয়
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে আগে ঋণ পরিশোধ প্রাধান্য পাবে। যদি জমাকৃত অর্থ দিয়ে ঋণ ও হজ দুটি সম্ভব না হয়, তাহলে হজ ফরজ হবে না। আগে ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
‘মৌলিক প্রয়োজন’ কী?
মৌলিক প্রয়োজন বলতে অপচয় বাদ দিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য যা অপরিহার্য, তা-ই বোঝানো হয়েছে। যেমন—বসবাসের জন্য একটি ঘর, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, পেশাসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি এবং জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ।
তাই একমাত্র বসতবাড়ি বা প্রয়োজনীয় গাড়ি বিক্রি করে হজ করা ফরজ নয়। তবে একাধিক সম্পদ থাকলে অতিরিক্ত অংশ সামর্থ্যের মধ্যে গণ্য হবে।
একইভাবে বিয়েও মৌলিক প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। কারো বিয়ের প্রয়োজন থাকলে, হজের আগে বিয়ে প্রাধান্য পাবে।
শারীরিকভাবে অক্ষম হলে করণীয়
যদি সাময়িক অসুস্থতা থাকে, তাহলে সুস্থ হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে। আর স্থায়ীভাবে অক্ষম হলে অন্য কাউকে দিয়ে ‘বদলি হজ’ করানো যাবে। এ বিষয়ে সহিহ হাদিসে নির্দেশনা পাওয়া যায়।
নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ শর্ত
নারীর হজ ফরজ হওয়ার জন্য মাহরাম সঙ্গে থাকা শর্ত। বোখারি ও মুসলিমে এ বিষয়ে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তবে নারীর হজের জন্য স্বামীর অনুমতির শর্ত নেই। ওপরের শর্তগুলো পাওয়া গেলে স্বামীর অনুমতি ছাড়াই হজ করতে পারবেন নারীরা।
সূত্র : আল-শারহুল মুমতি, ৭ /৫-২৮।