August 17, 2026, 3:25 pm
Title :
শিগগির জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে: জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ছয় মাসে জনগণের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে সরকার: মাহদী আমিন রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন এসেছে: প্রেস সচিব সরকারের ১৮০ দিন নিয়ে ই-বুক ব্যবসায়ী হত্যা মামলায় সাবেক এমপি মিলনকে গ্রেফতার দেখানোর আদেশ মাছ উৎপাদনে মান নিশ্চিত করে রপ্তানি বাড়াতে হবে: আমিন উর রশিদ সরকার কাজ করছে, দৃশ্যমান হতে সময় লাগবে: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত বিনিয়োগ-ব্যাংকিং-জ্বালানি সংকট, তারেক রহমানের সরকারের অর্জন কতটা? শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু-ফারজানাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া ই-রিকশা চার্জে জরিমানা, নিবন্ধন-নবায়ন হবে না

রাজনীতির জমিদারি প্রথা ভেঙ্গে নিরাপদ ক্যাম্পাস চাই।

Reporter Name
  • Update Time : Monday, August 17, 2026
  • 33 Time View

আগস্ট ২০২৬ এর শুরুতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়াসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে যে ন্সহিংসতা এবং মারামারি ঘটে চলেছে, তা বিপ্লবের পরবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চিত্র হতে পারে না।
চলমান সংসদের ভেতরের রাজনৈতিক পরিবেশ আর সংসদের বাইরে সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে জাতিকে যেন এক ধরনের বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সংসদের ভেতরে আলোচনা ও বক্তব্য, আর বাইরে প্রতিরোধ, হুঁশিয়ারি ও নানা ধরনের পদক্ষেপ—এই দ্বৈত রাজনৈতিক আচরণ সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

একসময় বলা হতো, “শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড” কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড হতে পারে না; সুশিক্ষাই জাতির প্রকৃত মেরুদণ্ড। শিক্ষা যদি মানুষের নৈতিকতা, বিবেক, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে না পারে, তাহলে সেই শিক্ষা জাতির জন্য কতটা কল্যাণকর—সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আরেকটা বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় সামগ্রিক পাসের হার ৫৮.৮৩%, যেখানে ২০২৪ সালে ছিল ৭৭.৭৮%। ফলাফলের এই বড় ব্যবধান অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন করেছে। শিক্ষার্থীদের ফলাফল, নিরাপদ ক্যাম্পাস ও শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পাঠদান পদ্ধতি নিয়ে শিক্ষকদের যোগ্যতা ও দায়িত্বশীলতা বিষয়ে পর্যালোচনা এবং বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী।

______আমরা একই আলো বাতাসে বেড়ে উঠা জাতি। একই ভাষায় মনের অনুভূতি প্রকাশ করি, একই সংস্কৃতিকে বুকে ধারণ করি একি নির্যাতনের শিকার হয়ে গত ১৭টি বৎসর ফ্যাসিস্ট সরকারের অমানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি। এমনকি প্রতিদিন একই মসজিদে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে এক সৃষ্টিকর্তার সামনে সিজদায় মাথানত করি, এবং নিকট-অতীতে প্রার্থনা করেছি নিরাপদ ক্যাম্পাসের জন্য।

অথচ দৃশ্যপট বদলে যায় কেবল একটি জায়গায়—মতাদর্শের ভিন্নতায়। ক্যাম্পাসের পিচঢালা পথে কিংবা রাজপথে যখন একই দেশের, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী তার সহপাঠীকে কেবল রাজনৈতিক বা চিন্তাগত মতপার্থক্য থাকার কারণে অমানুষিকভাবে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে, কিংবা প্রাণ কেড়ে নেয়, তখন প্রশ্ন জাগে— আমরা কি আদৌ কোন ফ্যাসিস্ট সরকারের অনুগত্য ছিলাম? নাকি অন্ধ ব্যক্তি চোখের আলো ফিরে পাওয়ার সাথে সাথেই যেমন ভরসার লাঠিটি ছুঁড়ে ফেলে দেয়, এটি যেন ঠিক তেমনই এক অকৃতজ্ঞতার প্রকাশ।”

আপাতদৃষ্টিতে আমরা আধুনিক ও গণতান্ত্রিক সমাজে বসবাস করছি বলে মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে রাজনীতি ও সমাজ পরিচালনায় সেই পুরাতন জমিদারী প্রথারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে। জমিদাররা একদল লাঠিয়াল বাহিনী ব্যবহার করত খাজনা আদায় কিংবা শোষণ করার জন্য আর আজ রাজনৈতিক দলের নেতারা যেন সেই জমিদার, আর তাদের ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলো অনেক ক্ষেত্রে সেই আধুনিক লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকা পালন করছে। রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, প্রতিপক্ষকে দমন এবং নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এসব সংগঠনকে ব্যবহার করার প্রবণতা মূলত আধিপত্যবাদী রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ।

শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরেও আমরা নানা ধরনের শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করে রেখেছি—জাত, বর্ণ, উচ্চ-নিচ, ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-দুর্বল ইত্যাদি। রাজনীতিবিদরা অনেক সময় এই বিভাজনকে নিজেদের স্বার্থে আরও গভীর করে তোলেন। একটু ভেবে দেখুন—টাকা যখন একজন তথাকথিত ‘নিচু’ শ্রেণির মানুষের হাত থেকে খ্যাতিমান ব্যক্তির হাতে আসে, তখন সেই টাকা নিতে তাদের কোনো অপমান বোধ থাকে না। নিয়ম অনুসারে ছোট লোকের অর্থ কিংবা সম্পত্তি নিলে তো জাত যাওয়ারই কথা কিন্তু মানুষের শ্রম ও অর্থকে আমরা গ্রহণ করি, কিন্তু মানুষটির মর্যাদাকে স্বীকার করতে চাই না। এটি মূলত দাসত্বেরই এক পরিশীলিত কৌশল।

____একইভাবে ধর্মীয় অঙ্গনেও নানা মত, উপমত ও গোষ্ঠীগত বিভাজন তৈরি হয়েছে।
সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রের মতো ধর্মীয় অঙ্গনেও একই আধিপত্যবাদের ছায়া স্পষ্ট। আলেম সমাজের মধ্যে আহলে কিতাব, আহলে হাদিস, আহলে সুন্নাত, শিয়া সুন্নি ওহাবী, ইত্যাদি বহু নামে বিভিন্ন ফিরকা ও মতপার্থক্য তৈরি করে নিজস্ব গোষ্ঠী গঠন করছেন। এর মূল উদ্দেশ্য সত্যের সন্ধান নয়, বরং নিজেদের অনুসারী বাড়ানো এবং ধর্মীয় ক্ষেত্রে নিজস্ব প্রভাব জীবিকা নির্বাহ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
আজকের বাংলাদেশে ওয়াজ মাহফিল ব্যস্ত হাজার বছরের পুরানো ইতিহাস ও আখেরাতের ফজিলতের আলোচনায়, কিন্তু বর্তমান সমাজে আত্মনির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকার বাস্তব দিকনির্দেশনার কোন আলোচনা নেই।
__অন্যদিকে, রাজনীতিবিদরাও সীমাবদ্ধ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী রাজনীতি নিয়ে। জাতিকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলার কোনো বাস্তবমুখী পদক্ষেপ বা ভাবনা—আলেম কিংবা রাজনীতিবিদ, কারও মধ্যেই দেখা যাচ্ছে না।

মানবাধিকার সংস্থা যেমন: অধিকার, আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং জাতীয় পত্রিকার তথ্য মতে, ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশের সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক সংঘর্ষে প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় (OHCHR) ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ থেকে ৬ আগস্টের সহিংসতায় সারা দেশে প্রায় ২৫০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। যার বেশিরভাগই স্কুল কলেজ এবং মাদ্রাসার ছাত্র ছিল।
গোলাগুলি ও হত্যার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে মাসের পর মাস ক্যাম্পাস বন্ধ রাখা হতো, যার ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন সেশনজটে আটকে পড়ত।
___প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও রাজনৈতিক ছাতা ও আইনি দুর্বলতার কারণে সিংহভাগ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার বা অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি।

ক্যাম্পাসে সহিংসতার প্রতিহত করার জন্য সরকার কিছু পদক্ষেপ নিতে পারত যেমন,___ সামাজিক বিজ্ঞানীদের মতে, ছাত্র রাজনীতির নামে পেশিশক্তির মহড়া ও ‘টর্চার সেল’ সংস্কৃতি দূর করতে হলে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে ডাকসু বা জাকসুর মতো নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সুস্থ ধারার প্রতিনিধিত্ব তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা: রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
দলীয় প্রভাবমুক্ত ক্যাম্পাস প্রশাসন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনকে দলীয় প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করা।
সন্ত্রাস ও অস্ত্র সংস্কৃতি বন্ধের উদ্যোগ: ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির নামে পেশিশক্তি, অস্ত্র সংস্কৃতি ও সিট দখলের মতো অনৈতিক চর্চা চিরতরে বন্ধ করা।
শিক্ষার্থী ও সুশীল সমাজের সচেতনতা: সহিংস রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষার সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও নাগরিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হওয়া।
উপসংহার:
__ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে, ভয় দেখিয়ে বা রক্ত ঝরিয়ে কোনো মতাদর্শকে মুছে ফেলা যায় না; বরং তা সমাজে কেবল ক্ষোভ ও প্রতিশোধের জন্ম দেয়। দুঃখজনকভাবে, ক্ষমতার চাকা ঘুরলেও ক্যাম্পাসে কিংবা রাজনীতিতে সেই একই হিংস্রতার পুনরাবৃত্তি আমরা আজও দেখতে পাচ্ছি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো জ্ঞান অর্জনের পবিত্র স্থান, যেখানে শিক্ষার্থীরা হাতে খাতা-কলম নিয়ে দেশের স্বপ্ন তৈরি করতে আসে। অথচ সেই ক্যাম্পাসগুলোতে আজ রক্তক্ষয়ী অস্ত্র ও সহিংসতার মহড়া দেখা যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই মানা যায় না। এই নিরাপত্তাহীনতার দায়ভার প্রশাসন কিংবা সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। যদি অবিলম্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপদ ও সুস্থ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা না যায়, তবে আমাদের পুরো জাতির ভবিষ্যৎ চিরতরে অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।

মিসবাহ উদ্দিন আহমদ

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © ajkerdorpon.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com