January 16, 2026, 1:50 am

সরকার নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারবে কিনা- সন্দেহ দেবপ্রিয়র

Reporter Name
  • Update Time : Thursday, January 15, 2026
  • 4 Time View

অন্তর্বর্তী সরকার আদৌ নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে কিনা— এমন সন্দেহ পোষণ করেছেন সিপিডির (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার মতে, গণতন্ত্র, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ‘নতুন বন্দোবস্ত’ বাস্তবায়নে কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি, বাংলাদেশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৬: আগামী সরকারের জন্য নাগরিক সুপারিশ’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, নতুন বন্দোবস্ত নিয়ে যে প্রতিশ্রুতি, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে এর প্রত্যাশিত প্রতিফলন ঘটেনি– এ কথা রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই স্বীকার করেছে। তার মতে, সংস্কারের ক্ষেত্রে উপরি কাঠামো— সংবিধান সংশোধন, শাসনতান্ত্রিক ভারসাম্য কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ পরিবর্তনের কথা বললেও সমাজের অর্থনৈতিক শক্তিগুলোকে সংগঠিত না করায় কাঠামো টেকেনি। বাংলাদেশে অতীতেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছিল, তবে তা টেকেনি। কারণ, এসব পরিবর্তনের পক্ষে থাকা সামাজিক শক্তিগুলোকে সংগঠিত করা হয়নি।

নতুন বন্দোবস্তের দাবিদাররাই শেষ পর্যন্ত ‘পুরোনো বন্দোবস্তের’ অংশ হয়ে পড়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যয়বহুল নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার ফলে পুরোনো কায়েমি স্বার্থ আবারও শক্ত অবস্থান ফিরে পেয়েছে।

তার ভাষায়, ব্যবসায়ীরা পালালেও, রাজনীতিবিদরা আত্মগোপনে গেলেও প্রবল আমলাতন্ত্র ফিরে এসেছে, কারণ পুরোনো বন্দোবস্তের সবচেয়ে বড় রক্ষক এই আমলাতন্ত্র। অন্তর্বর্তী সরকারই আমলাতন্ত্রের পুনরুত্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। সরকার অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেনি অভিযোগ করে তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত সরকার একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এতে সরকার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠছে—সরকার কি নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে?

গণমাধ্যম প্রসঙ্গ

সংলাপে গণমাধ্যম প্রসঙ্গেও ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সমালোচনা করেন। এক প্রশ্নের উত্তরে অতীতে গঠিত মিডিয়া কমিশনের কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। যে মিডিয়া প্রতিষ্ঠান নিজের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে না, তার অন্যের কাছে স্বচ্ছতা দাবি করার নৈতিক অধিকার সীমিত। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে পেশাজীবী সংগঠনগুলো স্বাধীন ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ; ফলে সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থ রক্ষা ব্যাহত হয়েছে।

তার মতে, গণতন্ত্র না থাকলে এবং মালিকপক্ষ যদি লুটপাটতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ হয়, তাহলে প্রকৃত মিডিয়ার স্বাধীনতা ‘সোনার পাথরবাটি’র মতো।

১২ নীতি ঘোষণা ও ১০টি জাতীয় কর্মসূচি

সংলাপে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম তাদের নাগরিক ইশতেহারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড প্রকাশ করে। ইশতেহারে সামষ্টিক অর্থনীতি থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও গণতন্ত্র— মোট ১২টি নীতি-বিবৃতি ঘোষণা করা হয়।

নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান এবং সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান নীতি ঘোষণা ও কর্মসূচি তুলে ধরেন।

১০টি জাতীয় কর্মসূচি হলো– সর্বজনীন ন্যূনতম আয়, শিক্ষার্থীদের স্কুল মিল প্রোগ্রাম, যুব ক্রেডিট কার্ড, জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ড, কৃষক স্মার্ট কার্ড, শ্রমবাজার তথ্য প্ল্যাটফর্ম, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, সমন্বিত নগর পরিবহন, সমন্বিত কর ও সম্পদ তথ্য ব্যবস্থা এবং জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি।

তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, এসব প্রস্তাব শুধু আকাঙ্ক্ষা নয়, আর্থিক সক্ষমতা ও বাস্তবায়ন ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষায় নতুন প্রস্তাব

এসডিজি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে বয়স্কভাতার আওতাভুক্ত ৬১ লাখ বয়স্ক নাগরিককে জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ডের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বার্ষিক খরচ হবে জিডিপির ১ শতাংশ। পরিবারপ্রতি বছরে এক লাখ টাকার চিকিৎসা সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম।

চিকিৎসা ব্যয়ের দুশ্চিন্তার প্রতিকার ও প্রতিটি জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে পরিবারপ্রতি বছরে এক লাখ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা খরচ চালুর প্রস্তাব করেছে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম।

তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বয়স্ক ভাতার আওতাভুক্ত ৬১ লাখ বয়স্ক নাগরিককে এ সুবিধার আওতায় আনা হলে বছরে খরচ হবে ৬১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ শতাংশ। এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হলে দরিদ্র ও বয়স্করা জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবেন না।

এ ছাড়া, যুব ক্রেডিট কার্ড চালুর মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত তরুণের ভবিষ্যৎ গড়তে বছরে এক লাখ টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ও জামানতহীন ঋণ সুবিধা চালু এবং সর্বজনীন ন্যূনতম আয় হিসেবে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য প্রতি মাসে চার হাজার ৫৪০ টাকা নগদ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে সংস্থাটি।

কৃষক স্মার্টকার্ড চালুর প্রস্তাব

এসডিজি বাস্তবায়নে দেশের সব প্রকৃত কৃষকের জন্য স্মার্টকার্ড সেবা বিতরণের সুপারিশ করেছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। দেশের নারী-পুরুষ উভয় ১ দশমিক ৬৫ কোটি কৃষক পরিবারকে এ সুবিধার আওতায় সব ধরনের সেবা পৌঁছানোর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকারের পরিচালিত ‘পার্টনার’ প্রকল্প পরিমার্জনের মাধ্যমে কৃষকদের স্মার্টকার্ড বিতরণ ও সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এ জন্য বাড়তি কোনো বরাদ্দের দরকার হবে না। ডিজিটাল কৃষি সম্প্রসারণ সেবা ও ই-ভাউচার ভর্তুকি বাস্তবায়নে বার্ষিক বরাদ্দ প্রায় ১৫৯ কোটি টাকা।

রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের এই প্রস্তাবগুলো কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করছে বা করছে না, সেগুলোকেও নজরদারি ও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। এটিকে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন বাস্তবতা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

নারীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের নারী সমাজ এখন আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি সচেতন ও সক্ষম। এই সচেতন ও সক্ষম নাগরিক সমাজ ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক উত্তরণে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করবে।

ব্যবসায়ী-রাজনীতি-আমলাতন্ত্র ‘নেক্সাস’ নিয়ে সতর্কতা

সংলাপে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি আসিফ ইব্রাহীম বলেন, ব্যবসায়ী, আমলাতন্ত্র এবং ক্ষমতাসীন সরকারের মধ্যে যে আঁতাত তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার পাশাপাশি তাদের সার্বভৌমত্ব থাকা জরুরি। অতীতে দেখা গেছে, ক্ষমতাসীনরা ব্যক্তি খাতকে দখল করে নিয়েছে এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নির্বাচন বন্ধ করে দিয়ে নিজেদের লোক বসিয়েছে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য বাণিজ্য সংগঠনে গণতন্ত্র চর্চা এবং নেতৃত্ব তৈরি প্রয়োজন।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রাথমিকের মতো এমপিওভুক্ত স্কুলের শিশুদের জন্যও আমরা মিড ডে মিলের প্রস্তাব করেছি। এটা শুধু এসডিজির লক্ষ্য নয়, লাইফ লং লার্নিংয়ের জন্যও কাজে লাগবে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী শাহীন আনাম বলেন, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর ক্রমাগত নিপীড়ন, নির্যাতন এবং তাদের ধর্মীয় ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মিথ্যা প্রচার চালিয়ে এসব হামলা করা হয়। দুঃখজনক হলো, এসব ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির তেমন কোনো বড় পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না, যা সমাজে একটি বিচারহীনতার বার্তা দিচ্ছে।

মানবাধিবার কর্মী সুলতানা কামাল বলেন, নির্বাচনের আগে ইশতেহার দিলেও ভোটের পর দলগুলো তা অনেক সময় আমলে নেয় না। ১৯৯০ সালে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের নেতৃত্বে গঠিত টাস্কফোর্সের মতো অতীতেও অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা সেই টাস্কফোর্সের সদস্য ছিলেন। সমস্যা হলো, সরকার ও জনগণের মধ্যে একটি বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে; যারা ক্ষমতায় যায় তারা ভুলে যায় যে তারা জনগণের প্রতিনিধি। এই রাষ্ট্রটির অন্যতম উপাদান হলো নাগরিক এবং ইশতেহার বা সংবিধান যাই হোক না কেন, তা মূলত জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হওয়া উচিত।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © ajkerdorpon.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com