মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে যখন ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং এর মধ্যবর্তী পেরিম দ্বীপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংঘাতে কৌশলগত এই দ্বীপটির দখল চলে যাওয়ায় ওই অঞ্চলের আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ইয়েমেন সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এই অঞ্চলগুলো হাতবদলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, যা মূলত লোহিত সাগরে বিদ্রোহীদের প্রভাব বিস্তারের বড় একটি ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরপরই সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের নাশকতামূলক হামলার ঘটনা ঘটে।
কৌশলগত এই ভূখণ্ড হাতবদল হওয়ার কিছুদিন পর, গত ৯ সেপ্টেম্বর সকালে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ এবং পবিত্র মদিনা অঞ্চলের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা চালানো হয়। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের তেল পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ধমনী হলো এই পাইপলাইন, যার ওপর দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল পরিবাহিত হতো। স্যাটেলাইট চিত্রে মদিনার দক্ষিণাংশে এই পাইপলাইনের একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠতে দেখা যায়। এই হামলায় পাইপলাইনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন হতাহতের ঘটনা ঘটে।
সৌদি আরবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, হামলার পরপরই সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে এবং পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। সাধারণত প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচলের দীর্ঘ জট ও ঝুঁকি এড়িয়ে তেল পরিবহন করা সম্ভব হতো। তবে এই হামলার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি একশ ডলারের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের হামলার জেরে বর্তমানে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ গত তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
প্রাথমিকভাবে হামলার উৎস স্পষ্ট না হলেও, পরবর্তীতে বাগদাদ ও রিয়াদ উভয়পক্ষই নিশ্চিত করেছে যে ড্রোনগুলো মূলত প্রতিবেশী ইরাক থেকে ছোঁড়া হয়েছিল যেখানে ইরানপন্থি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এই ঘটনার পর আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ইরাকি সামরিক বাহিনী সংশ্লিষ্ট এক শীর্ষ কমান্ডারকে বরখাস্ত করেছে। অন্যদিকে, উদ্ভূত এই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তার অনুরোধ জানালেও তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন সেই আবেদন নাকচ করে দেয়। সংঘাতের এই নতুন মোড় এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থমকে যাওয়ায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।