ইসলামাবাদ-বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠতা বহু বছরের। এরই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই চীন সামরিক বাহিনী মোতায়েন করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বালুচ নেতা মির ইয়ার বালুচ। তিনি বলেছেন, ইসলামাবাদ ও বেইজিংয়ের মধ্যে ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা কৌশলগত জোট বালুচিস্তানের জন্য একটি গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে।
নতুন বছরের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের উদ্দেশে লেখা এক খোলা চিঠিতে মির ইয়ার বালুচ এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। চিঠিতে ভারতকে অটল সমর্থন জানিয়েছেন তিনি। চিঠিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও ট্যাগ করেন তিনি। সেখানে মির ইয়ার বালুচ উল্লেখ করেন, বালুচ প্রতিনিধিরা ইসলামাবাদ ও বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারিত্বকে “বিপজ্জনক” হিসেবে দেখছেন।
চিঠিতে মির ইয়ার বালুচ দাবি করেন, বালুচিস্তান দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে নিপীড়নের শিকার। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই সময়ে রাষ্ট্রীয় মদদে সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেছে। তিনি লেখেন, ‘গত ৭৯ বছর ধরে বালুচিস্তানের মানুষ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় দখল, রাষ্ট্রপোষিত সন্ত্রাসবাদ এবং নৃশংস মানবাধিকার লঙ্ঘন সহ্য করে আসছে। এখন সময় এসেছে এই গভীরভাবে প্রোথিত সংকটকে মূল থেকে উপড়ে ফেলার, যাতে আমাদের জাতির জন্য স্থায়ী শান্তি ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা যায়।’
চিঠিতে আরও বলা হয়, ইসলামাবাদ-বেইজিং দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্পের চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের এই ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পটি বেলুচিস্তানের ভেতর দিয়েই বাস্তবায়িত হচ্ছে। মির ইয়ার বালুচ বলেন, ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান, পাকিস্তান ও চীনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত জোটকে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে দেখে। পাকিস্তানের সহযোগিতায় চীন সিপিইসি প্রকল্পকে তার শেষ ধাপে নিয়ে গেছে।’
তিনি আরও দাবি করেন, বালুচ প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর সক্ষমতা যদি আরও জোরদার না করা হয় এবং আগের মতোই উপেক্ষিত থাকে, তাহলে শিগগিরই বেলুচিস্তানে সরাসরি চীনা সামরিক উপস্থিতি দেখা যেতে পারে। মির ইয়ার বালুচ সতর্ক করে বলেন, স্থানীয় জনগণের সম্মতি ছাড়া বেলুচিস্তানে চীনা সেনা মোতায়েন হলে এর প্রভাব শুধু ওই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তিনি লিখেন, ‘৬ কোটি বালুচ জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বালুচ মাটিতে চীনা সেনাদের উপস্থিতি ভারত (ভারত) ও বেলুচিস্তান—উভয়ের ভবিষ্যতের জন্য কল্পনাতীত হুমকি ও চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে।’
চিঠিতে মির ইয়ার বালুচ পাকিস্তান ও পাকিস্তান-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ অভিযানেরও প্রশংসা করেন। তিনি লিখেন, ‘পেহেলগাম সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী ঘাঁটির বিরুদ্ধে অপারেশন সিঁদুরের মাধ্যমে মোদি সরকারের দৃঢ় ও সাহসী পদক্ষেপ আমরা প্রশংসা করি। এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রতি ভারতের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রমাণ।’
চীন ও পাকিস্তান বারবার দাবি করে আসছে, সিপিইসি প্রকল্প পুরোপুরি অর্থনৈতিক এবং এর আড়ালে কোনো সামরিক সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য নেই। তবে ভারত শুরু থেকেই এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছে। ভারতের বক্তব্য, সিপিইসি পাকিস্তান-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের মধ্য দিয়ে গেছে, যা ভারতের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
এর আগে চলতি বছর রাজ্যসভায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং লিখিত উত্তরে জানান, সিপিইসি নিয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট ও অপরিবর্তিত। পাকিস্তানের অবৈধ দখলে থাকা লাদাখ ও জম্মু-কাশ্মীরের অংশ দিয়ে সিপিইসি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিবাদ জানিয়ে ভারত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে এসব কার্যক্রম বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে এবং তৃতীয় কোনো দেশের অংশগ্রহণ বা প্রকল্প সম্প্রসারণকে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করে। এ বিষয়ে এখনও পর্যন্ত ভারত সরকার কিংবা চীন ও পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মির ইয়ার বালুচের দাবির জবাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।