কারাকাসের সুরক্ষিত বাঙ্কার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর ঝটিকা অভিযানে আটক হওয়ার পর সোমবার নিউইয়র্কের ম্যানহাটন ফেডারেল আদালতে হাজির করা হয়েছে অপহৃত ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে। হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় ও কড়া সশস্ত্র প্রহরায় মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আদালতে নেওয়ার ছবি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
এদিকে মাদুরোকে আটকের বৈধতা নিয়ে বিতর্কে বসেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো ভেনেজুয়েলার ঘটনায় বাংলাদেশও উদ্বেগ জানিয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, শনিবার ভোর হওয়ার আগে গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী হেলিকপ্টারে করে কারাকাসে অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে। এরপর তাদের সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। লাতিন আমেরিকায় ১৯৮৯ সালে পানামায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর এটিই সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টার থেকে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে সোমবার সকালে সশস্ত্র পাহারায় ম্যানহাটন ফেডারেল কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়। এই সেই বিতর্কিত কারাগার যেখানে যৌন অপরাধী ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েল এবং হিপ-হপ তারকা পি ডিডি-কেও রাখা হয়েছিল।
নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মার্কিন আদালত অত্যন্ত গুরুতর সব অভিযোগ এনেছে। প্রসিকিউটরদের দাবি অনুযায়ী, মাদুরো গত ২৫ বছর ধরে তার সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার টন কোকেন পাচারের একটি বিশাল সিন্ডিকেট পরিচালনা করেছেন। এই মাদক পাচারের কাজ নির্বিঘ্ন করতে তিনি ও তার সহযোগীরা অবৈধভাবে ভারী মেশিনগান এবং বিভিন্ন ধরনের বিপজ্জনক বিস্ফোরক ব্যবহার করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া মাদুরোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের সঙ্গে আঁতাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে মার্কিন প্রশাসন। অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি মেক্সিকোর কুখ্যাত সিনালোয়া কার্টেল এবং কলম্বিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মাদক ব্যবসায় সরাসরি লজিস্টিক সহায়তা ও নিরাপত্তা প্রদান করেছেন।
সুর নরম করলেন নতুন নেত্রী ডেলসি রদ্রিগেজ
মাদুরোর দীর্ঘ ১৩ বছরের শাসনামলে অন্যতম কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন ডেলসি রদ্রিগেজ। কিন্তু মাদুরো অপসারিত হওয়ার পর তার সুর রাতারাতি বদলে গেছে। রবিবার তিনি বলেন, “আমরা মার্কিন সরকারের সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সম্মানজনক সম্পর্ক চাই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, আমাদের অঞ্চল যুদ্ধ নয় বরং শান্তি ও সংলাপের দাবিদার।”
বিশ্লেষকদের মতে, রদ্রিগেজের এই পরিবর্তন কৌশলগত। একদিকে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে সহযোগিতা না করলে তাকে মাদুরোর চেয়েও ‘বড় মূল্য’ দিতে হবে, অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদের ওপর মার্কিন আধিপত্য ফিরিয়ে আনার স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প।
ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি
ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুদ থাকলেও কয়েক দশকের অব্যবস্থাপনায় তা বর্তমানে রুগ্ণ দশায়। ট্রাম্প সরাসরি বলেছেন, “ওরা যা চুরি করেছিল, আমরা তা ফেরত নিচ্ছি।” তিনি মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলায় পাঠিয়ে পরিকাঠামো পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ভেনেজুয়েলার তেলের উৎপাদন আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিতে বছরে অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন সামরিক উপস্থিতির প্রয়োজন হতে পারে।
অনিশ্চয়তায় ভেনেজুয়েলা
কারাকাসের রাস্তায় এখন থমথমে পরিস্থিতি। সাধারণ মানুষ ভবিষ্যৎ অস্থিতিশীলতার ভয়ে খাদ্য ও ওষুধ মজুদ করছে। ট্রাম্পের এই ঝটিকা জয় তাকে মার্কিন রাজনীতিতে শক্তিশালী করলেও লাতিন আমেরিকার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে এক চরম উত্তেজনার মুখে ঠেলে দিয়েছে। কলম্বিয়া, মেক্সিকো ও কিউবার ওপরও একই ধরনের চাপের হুমকি দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদুরোর বিচার শুরু হতে মাসের পর মাস, এমনকি এক বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে। তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়মুক্তির দাবি তুলতে পারেন, তবে পানামার সাবেক নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগার মামলার নজির তার জন্য বড় বাধা হতে পারে।
এই নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ শুধু ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের গতিপথকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
মাদুরোর আটকের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। চীন ও রাশিয়া একে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই প্রশ্ন তুলেছেন, “কোন দেশ কি নিজেকে বিশ্বের বিচারক বা পুলিশ ভাবতে পারে?”
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আজ এই অভিযানের বৈধতা নিয়ে আলোচনা হবে। মার্কিন দূত মাইক ওয়াল্টজ যুক্তি দিয়েছেন, মাদক সম্রাট মাদুরোর বিরুদ্ধে এই অভিযান ‘আত্মরক্ষার’ খাতিরে করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র তার ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে যেকোনো আইনি পদক্ষেপ আটকে দিতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্বেগ
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেসের পক্ষে তার সহকারী মহাসচিব রোজমেরি ডিকার্লো একটি বিবৃতি পাঠ করেন। বিবৃতিতে গুতেরেস বলেছেন, ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের ক্ষেত্রে “আন্তর্জাতিক আইনের বিধিবিধান মানা হয়নি। যা নিয়ে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
“এমন পদক্ষেপের ফলে দেশটিতে অস্থিতিশীলতা আরও বাড়তে পারে। ওই অঞ্চরে এর প্রভাব কী হতে পারে এবং রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি কী ধরনের দৃষ্টান্ত রাখে সেটিও একটি উদ্বেগের বিষয়।”
ভেনেজুয়েলার ঘটনায় বাংলাদেশের উদ্বেগ
ভেনেজুয়েলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঢাকা বিশ্বাস করে যেকোনো বিরোধের সমাধান কূটনীতি ও সংলাপের মাধ্যমে হওয়া উচিত। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।